সম্পাদকীয়
পরিবহন সংকটের কী সমাধান, কবে সমাধান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পৃথিবীর প্রায় সব বড় শহরগুলোতে বাস ব্যবস্থাপনা হলো গণপরিবহনের মূল মেরুদণ্ড। কিন্তু বাংলাদেশে বাস সেবাকে রেখে দেওয়া হয়েছে সেকেলে অবস্থায়। অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত এ খাত মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারছে না। প্রতিদিন ফিটনেসবিহীন বাসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাখো মানুষ যাতায়াত করছেন। যানজটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর লড়াই করছেন। দৃশ্যটি আমাদের রাজধানীর প্রতিদিনের স্থিরচিত্র হয়ে উঠেছে।
মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার— কিছুই রাজধানীর রাস্তাঘাটের এই ধুঁকে ধুঁকে চলার ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে পারছে না। যেখানে গণপরিবহন বাড়ার কথা, সেখানে বাড়ছে ব্যক্তিগত গাড়ি আর খরুচে অবকাঠামো।
আগামীর সময় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০১৬-২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নতুন নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা ২১ হাজার ৭৫১টি। একই সময়ে নিবন্ধিত হয়েছে ৯ লাখ ৬ হাজার ৮৭২টি মোটরসাইকেল এবং ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯৮১টি ব্যক্তিগত গাড়ি। অর্থাৎ গত এক দশকে একটি বাসের বিপরীতে নিবন্ধিত হয়েছে প্রায় ৪২টি মোটরসাইকেল এবং ছয়টি ব্যক্তিগত গাড়ি। শ্রমিক, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত ঢাকায় গণপরিবহনই হওয়ার কথা ছিল প্রধান ভরসা। অথচ সেখানে রাজত্ব করছে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল। সড়কের সীমিত জায়গা ক্রমেই দখল করে নিচ্ছে এসব বাহন। আর সেই চাপের ভার বহন করছে ঢাকা মহানগর।
৪০-৫০ বছর আগের পত্রিকায় চোখ রাখলে, গণপরিবহন সংকট নিয়ে অসংখ্য লেখা চোখে পড়ে। আজকের বাংলাদেশেও সেই গণপরিবহন সংকট কাটিয়ে ওঠা যায়নি। জনসংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে গণপরিবহন নামানো সম্ভব হয়নি। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র যানজট।
পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন বাস পরিবহন খাতের বড় সংকট। বিগত সরকারগুলো এ সংকট সমাধানে খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি। দুয়েকবার চেষ্টা হলেও তা ছিল দায়সারা। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, ফিটনেসবিহীন বা অনুপযুক্ত যানবাহন পরিচালনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গত ফেব্রুয়ারিতে ‘মোটরযান স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। ওই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রম করা যানবাহন স্ক্র্যাপ বা বাতিল না করে নতুন বা ব্যবহৃত কোনো যানবাহনের নিবন্ধন পাওয়া যাবে না। আইন লঙ্ঘন করলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নীতিমালা আছে, প্রয়োগ কোথায়? কোথায় থেমে যাচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা? বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং সংবাদমাধ্যমের তদন্তে প্রায়ই উঠে আসে রাজনৈতিক কর্মী, অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিআরটিএর একটি অংশের যোগসাজশ ও দুর্নীতির কারণে রাজধানীসহ সারা দেশেই হাজার হাজার ফিটনেসবিহীন বাস চলাচল করছে। এই সিন্ডিকেট কি সরকারের চেয়েও বিস্তৃত, নাকি সরকারই তার অংশ হয়ে উঠেছে? সরকার যায়, সরকার আসে— পরিবহন সিন্ডিকেট একই থাকে, অন্তত ভোগান্তি আর অনিয়মের বদল হয় না।
যাত্রী ভোগান্তি কমাতে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বেসরকারি খাত থেকে সরিয়ে বিআরটিসির মতো সরকারি কোম্পানির হাতে বাস ব্যবসা তুলে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন এবং পুরনো বাস তুলে দিয়ে উচ্চমানের মাত্র তিন হাজার বাস নামানোর কথা বলেছেন। ২০১৭ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হকও অনুরূপ একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। ২০১৭-২৬-এর মধ্যে সংকট ও সমাধান একই রয়ে গেছে। এর মধ্যে ঢাকার গণপরিবহন মালিক ও পরিবহন শ্রমিক নেতাদের ভাগ্যের বদল ঘটলেও সাধারণ শ্রমিকের ভাগ্য ও জনগণের ভোগান্তির কোনো পরিবর্তন হয়নি।




