কমছে চালকল বাড়ছে বেকার
- আদমদীঘির ২৩২ চালকলের মধ্যে চালু ৯০টি
- ১৪২টি বন্ধ হওয়ায় কর্মহীন ৫ হাজার শ্রমিক
- অটোমেটিক মিলের সঙ্গে পারছে না পাল্লা দিতে
- বেকার শ্রমিকদের মানবেতর জীবন, পেশা বদল

বর্তমানে উপজেলায় চালু রয়েছে সাধারণ ৯০টি এবং ১৩টি স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটিক) চালকল। ছবি: আগামীর সময়
বছরের পর বছর টানা লোকসানে বন্ধ হয়ে গেছে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার ১৪২টি চালকল (হাসকিং মিল)। উপজেলায় মোট সাধারণ চালকলের সংখ্যা ছিল ২৩২টি। চলতি বছর সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে চাল সরবরাহ করছে ৯০টি হাসকিং মিল। বর্তমানে উপজেলায় চালু রয়েছে সাধারণ ৯০টি এবং ১৩টি স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটিক) চালকল। অধিকাংশ চালকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধানসমৃদ্ধ এলাকা এবং দেশের সবচেয়ে বড় খাদ্যগুদাম (সান্তাহার সিএসডি ও সাইলো) এই উপজেলায় থাকায় নব্বই দশকের পর থেকে এখানে গড়ে ওঠে একের পর এক চাতাল ব্যবসা। অনেকে ফসলের জমিতেই চাতাল তৈরি করে শুরু করেন এ ব্যবসা। ভালো মুনাফা হওয়ায় চলতে থাকে এর ধারাবাহিকতা। একপর্যায়ে থেমে যায় গতি। ২০০০ সালের পর থেকে এলাকায় একের পর এক গড়ে ওঠে স্বয়ংক্রিয় চালকল। সেই কলে ধান সেদ্ধ ও শুকানো ছাড়াই সরাসরি কাঁচা ধান থেকে দ্রুত চাল উৎপাদন হতে থাকে। আর এতে একে একে বন্ধ হতে থাকে সাধারণ চালকলের ব্যবসা।
সাধারণ চালকল বন্ধ হওয়ার কারণ জানালেন সান্তাহার শহরের চালকল মালিক মতিয়ুর রহমান, তার একটি সাধারণ চালকলে ১৫ দিনে ধান ছাঁটাইয়ের ক্ষমতা ১৫৪ টন। প্রতিদিন ধানের প্রয়োজন হয় ১৪০ বস্তা (প্রতি বস্তা ৭৫ কেজি)। কিন্তু শহরের বৈশাখী নামের স্বয়ংক্রিয় চালকলে ১৫ দিনে তিনটি ইউনিটে ছাঁটাই ক্ষমতা ৪৮ হাজার টন ধান। প্রতিদিন এই চালকলে ধান প্রয়োজন হয় প্রায় তিন হাজার টনেরও বেশি। উৎপাদন ক্ষমতার বিশাল ব্যবধানের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার কারণে বন্ধ হতে থাকে একের পর এক সাধারণ চালকল।
নিজেদের সংকটাপন্ন অবস্থা তুলে ধরে তিনি বললেন, ‘নানা কারণে স্বয়ংক্রিয় চালকল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমরা টিকতে পারছি না। এর অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে হলো, ধান থেকে চাল উৎপাদনের আনুপাতিক হার। সাধারণ চালকলে প্রতি মণ ধান থেকে চাল উৎপন্ন হয় ২৫ কেজি। অথচ স্বয়ংক্রিয় চালকলে প্রতি মণে উৎপন্ন হয় প্রায় ২৮ কেজি। সাধারণ চালকলে ধান থেকে যে গুঁড়া ও তুষ বের হয়, তার মূল্য অনেক কম। অন্যদিকে স্বয়ংক্রিয় চালকলে ৬০০ মণ ধান থেকে চালের কুড়া বের হয় প্রায় ৪০ বস্তা। এসব কুড়া প্রতি ৫০ কেজি ওজনের বস্তার মূল্য প্রায় দুই হাজার টাকা। চালের কুড়া থেকে ভোজ্য তেল ও মাছসহ পশুপাখির খাবার তৈরি হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বেশি। এ ছাড়া স্বয়ংক্রিয় চালকল মালিকরা স্বল্প সুদে ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ পান। ধান কাটার পরপরই বেশি করে কিনে রাখতে পারেন। সেটি সাধারণ চালকলের মালিকরা পারেন না।’
ব্যবসার লোকসানের কথা তুলে ধরেন ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান, ‘বর্তমানে বাজারে ধানের দাম বেশি। তাই চাল তৈরি করে লাভ হচ্ছে না। বরং প্রতি বছর লোকসান গুনতে হচ্ছে। প্রতি মণে লোকসান হচ্ছে দেড় থেকে দুশ টাকা।’
এ ব্যবসায়ীর ভাষ্য, ‘দেড়শর বেশি চালকল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে গেছেন। বর্তমানে সেসব শ্রমিক বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’
এমন জীবন কাটাছেন নারীশ্রমিক রেহেনা বেগম। বললেন নিজের কষ্টের কথা, ‘মিল বন্ধ হওয়ায় বর্তমানে একেবারে বেকার। একবেলা খেয়ে দুবেলা না খেয়ে দিন পার করছি। কেউ কেউ অন্য কাজে চলে যাচ্ছে।’
সাধারণ চালকল বন্ধ হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে আদমদীঘি উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা আবুল বাসার বললেন, ‘স্বয়ংক্রিয় চালকলের সংখ্যা বৃদ্ধি, ধানের দাম বেড়ে যাওয়া ও মূলধন হারানোসহ বিভিন্ন কারণে সাধারণ চালকল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’
উপজেলা খাদ্য বিভাগ থেকে জানা যায়, এ বছর ইরি-বোরো মৌসুমে উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১ হাজার ১৯৭ টন এবং প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ টন চাল। চলতি মৌসুমে শতভাগ ধান-চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করছে খাদ্য বিভাগ। সংগ্রহ করা চালের বেশিরভাগ সরবরাহ করেছে স্বয়ংক্রিয় চালকল। বাকিগুলো সরবরাহ করেছেন সাধারণ চালকল মালিকরা।




