নেইমার অধ্যায়ের সমাপ্তি

মরক্কোর সঙ্গে ড্র করলেও হাইতি আর স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ব্রাজিল। শেষ ৩২-এ পিছিয়ে পড়েও হারায় জাপানকে। তবে পথচলা থামে শেষ ষোলোয় নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে
‘এত বড় প্রতিভা ইয়ার্কিতেই ফুরাইল’, উনিশ শতকের বিখ্যাত কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রসঙ্গে কথাটি বলেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে কান্নায় ভেঙে পড়া নেইমারকে দেখে অনেকেই হয়তো এমন কিছুই ভাবছেন। কী অমিত সম্ভাবনা নিয়েই না ব্রাজিল দলে এসেছিলেন নেইমার! সেই সান্তোস, যেখান থেকে পেলে এসেছিলেন ব্রাজিল দলে সেই একই ক্লাবের হয়েই তার উন্মেষ। ২০১১ সালে কোপা লিবের্তোদোরেস জেতালেন সান্তোসকে, তখন থেকেই ইউরোপের ক্লাবগুলোয় তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি। বার্সেলোনা, পিএসজি হয়ে সৌদি লিগ ঘুরে ফের যখন সান্তোসে ফিরলেন নেইমার, তখন তিনি অচল আধুলি। ২০২৬ বিশ্বকাপে অনেকটা জনতুষ্টির জন্যই নেইমারকে দলে নিয়েছিলেন কার্লো আনচেলত্তি। মোট ৩৮ মিনিট খেলেছেন, পেনাল্টি থেকে একটি অর্থহীন গোল করেছেন, স্পটকিকটা নেওয়ার আগে নর্ডিক গোলকিপার নাইল্যান্ডের সঙ্গে বিস্তর গালাগালি করেছেন আর ম্যাচ শেষে করেছেন কান্নাকাটি। এভাবেই শেষ হলো ব্রাজিল দলে নেইমার অধ্যায়, নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ১৬ থেকেই বিদায় নিল ব্রাজিল আর নেইমারও বলে দিলেন, জাতীয় দলে এখানেই শেষ।
২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির দল ঘোষণার দিনে সংবাদ সম্মেলনে হাজির ছিলেন ১৩ দেশের প্রায় ৭০০ জন সাংবাদিক। বেশিরভাগেরই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন নেইমার। আনচেলত্তি কি তাকে রাখবেন বিশ্বকাপের দলে? আনচেলত্তি তাকে রেখেছেন ২৬ জনের তালিকায়, তবে কখনোই এই ইতালিয়ানের মূল পরিকল্পনায় ঠাঁই হয়নি নেইমারের। এমনকি হাইতির বিপক্ষে ম্যাচের জন্য নেইমারকে দলের সঙ্গে মায়ামিতেই আনেননি আনচেলত্তি। নেইমার বিশ্বকাপে এসে শপিংয়ে গিয়েছেন, ১২ কোটি টাকার ঘড়ি কিনেছেন, এসব কারণেই এসেছেন সংবাদে। ব্রাজিলের মাঠের খেলায় তার অবদান সামান্যই। আনচেলত্তি তাকে নরওয়ের বিপক্ষে নামিয়ে হয়তো দুনিয়ার সামনে তুলে আনলেন সত্যিটাই, সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার মতো ফিটনেস আর নেই নেইমারের।
‘আমি চেষ্টা করেছি, আমি চেষ্টা করেছি, তবে এখন সব কিছু শেষ’, ম্যাচের পর গ্লোবো টিভিকে বলেছেন নেইমার। ২০২৩-এর পর এই বিশ্বকাপেই প্রথম জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন নেইমার, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে। জাপানের বিপক্ষে পিছিয়ে থাকার পরও তাকে নামাননি আনচেলত্তি, নরওয়ের সঙ্গে নামিয়েছেন ৬৭ মিনিটে। তখনো ম্যাচে গোলশূন্য সমতা। নেইমার সুযোগ পেয়েছিলেন ভিনিসিয়ুসের ক্রসে হেড করার বা ট্যাপ ইন করার, কোনো মার্কারও ছিল না তার সঙ্গে। কিন্তু সময় মতো পৌঁছাতেই পারেননি বলের কাছে, সেই ফিটনেসই যে তার নেই।
২০১৪ বিশ্বকাপটা শেষ হয়ে গিয়েছিল কামিলো সুনিগার হাঁটুর আঘাতে। ২০১৮ বিশ্বকাপে হারিয়ে দিল বেলজিয়াম, যে হারে আত্মঘাতী গোলের দায় আছে ফের্নান্দিনহোর। ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করেও জেতাতে পারলেন না, টাইব্রেকারে শেষ শটটা নেওয়ার অপেক্ষায় থেকে দেখলেন সতীর্থরা মিস করে খেলা আগেই হারিয়ে দিয়েছেন!
এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিলের হয়ে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের, ১০ আগস্ট ২০১০ সালে। অভিষেকে গোল করেছিলেন, বিদায়ী ম্যাচেও করলেন। জাতীয় দলে তার অর্জন হয়ে থাকল শুধু একটা কনফেডারেশনস কাপ আর রিও অলিম্পিক ফুটবলে সোনা। অথচ তাকে ঘিরে কত সোনালি স্বপ্নই না দেখেছিলেন বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অজস্র ব্রাজিল ভক্তরা।




