শেষ বিদায়ে স্তব্ধ তেহরান
শোকে কাতর, ক্ষোভে উত্তাল

সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ে তেহরানে জনসমুদ্র। ছবি: সংগৃহীত
কিছু শোক শুধু অশ্রুসিক্তই করে না, ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয় বুকে। আর্তনাদ-আহাজারি, কান্না-কেবলই দুর্বলতা নয়, কখনও কখনও তা অদম্য বারুদ। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ের মিছিলে সেই ঢেউই দেখা যায় তেহরানের জনসমুদ্রে। কাচে ঘেরা লাশবাহী লড়ি ঘিরে কান্নার রোল ওঠে রাজপথে। একই সঙ্গে ফুঁসে ওঠে উত্থিত মুষ্ঠির লাল পতাকা। অশ্রুভেজা চোখেই গর্জে ওঠে ‘কঠোর প্রতিশোধের’ হুংকারে। ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার স্লোগান!
সাত দিনব্যাপী শোকানুষ্ঠানের চতুর্থ দিন সোমবার ছিল সর্বসাধারণের শোকযাত্রা। প্রিয় নেতাকে মেষ বারের মতো একনজর দেখতে ঘর-বাড়ি ফেলে ছুটে আসে মানুষ। বিশ্বকে হতবাক করে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শোকমিছিলে পরিণত হয় তেহরানের এই শোকযাত্রা। জুলাইয়ের তীব্র গরমেও লাখে লাখো মানুষ। সবার গায়েই কালো পোশাক। কোলের শিশু থেকে বাড়ির বৃদ্ধ পর্যন্ত— এমনকি যার পা নেই, সেও এসেছে ক্রাচ নিয়ে।
তেহরানে প্রায় ১০ কিলোমিটারেরও বেশি পায়ে হেঁটে চলার মধ্য দিয়ে শেষ হয় মিছিল। আগের দিনের জানাজার পর তেহরানের দামাভান্দ সড়ক থেকে যাত্রা শুরু করে এদিন ইমাম হুসাইন সড়ক, ইনকিলাব সড়ক, ইনকিলাব চত্বর, আজাদি সড়ক ও আজাদি চত্বর অতিক্রম করে লাশকার মহাসড়ক পর্যন্ত নেওয়া হয় লাশবাহী গাড়ি। বিকেল ৫টায় শেষ হয় এ ১২ ঘণ্টার কর্মসূচি।
এই উপলক্ষ্যে ভোরে নামাজের পর থেকেই মেট্রো ও বাসস্টেশনগুলোতে মানুষের ঢল নামে। তারা উল্লিখিত সড়কগুলোতে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে যাত্রা শুরু করে। সবার হাতে লাল পতাকা— যা প্রতিশোধ ও যুদ্ধের প্রতীক। কারও লাল পতাকায় লেখা, ‘ইয়া লি-সারাতিল হুসাইন’, অর্থাৎ হুসাইনের রক্তের প্রতিশোধ; আবার কারও পতাকায় লেখা, ‘ইয়া লি-সারাতিল খামেনেই’। কোথাও লেখা, ‘আমরা প্রতিশোধ নেব’, আবার কোথাও লেখা, ‘আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব’। রক্তঝরা কণ্ঠে স্লোগান উঠছে—’আমেরিকার মৃত্যু হোক, ইসরায়েলের মৃত্যু হোক’, ‘আপস নয়, আত্মসমর্পণ নয়, শুধুই প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’। মানুষজন চিৎকার করে তাদের প্রিয় নেতাকে বলছে, ‘আপনি একাই চলে গেলেন, আমাকে কেন রেখে গেলেন?’ কেউ বলছে, ‘এখন আমরা আমাদের অভিযোগগুলো কার কাছে নিয়ে যাব?’ কেউ বলছে, ‘আমাদের তো আপনার জন্য জীবন দেওয়ার কথা ছিল, আপনি কেন আগে চলে গেলেন?’ আবার কেউ কান্না ভেজা কণ্ঠে বলছে, ‘ইয়া রাহবার, ইয়া রাহবার, আমাদের ছেড়ে যাবেন না, আমরা এতিম হয়ে গেছি।’
মেট্রোস্টেশন, বাসস্টেশন— সবখানেই উপচে পড়া ভিড়। রাস্তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু মানুষ আর মানুষ, তিল ধারণেরও জায়গা নেই— চিত্রগুলো থেকেই তা স্পষ্ট। বিনামূল্যে পানির বোতল দিচ্ছে, কেউ স্যান্ডউইচ, কেউ শরবত, কেউ রুটি, কেউ মাথার টুপি, কেউ তরমুজ— বলে শেষ করা যাবে না। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে, নিজ উদ্যোগে, তাদের প্রিয় নেতার জন্য এসব আয়োজন করেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে এই তিন দিনের জন্য আবাসন স্থল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যেন মানুষের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না হয়। সকাল থেকে আকাশে অবিরাম হেলিকপ্টার উড়তে দেখা গেছে। হেলিকপ্টার থেকে দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে, নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে। মানুষ তাদের প্রিয় নেতার জন্য কাঁদছে, মাতম করছে। দামাভান্দ সড়ক থেকে ইমাম খামেনেই ও তার শহীদ পরিবারের সদস্যদের মরদেহ একটি বিশাল ট্রাকে করে যাত্রা শুরু করে। ধীর, ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে সেই শোক যান। মানুষ গাড়ির চারপাশে দাঁড়িয়ে তাদের নেতাকে বিদায় জানাচ্ছে, আজারি করছে, মাতম করছে। কেউ কেউ দৌড়ে গাড়ির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যেন তাদের রুমাল বা কাপড়টি কফিনের সঙ্গে স্পর্শ করাতে পারে। শুধু কি ইরানিরাই ছিলেন মিছিলে? না, তার প্রভাব তো ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। লেবানন, পাকিস্তান, ভারত, ইরাক, ইয়েমেন থেকে শুরু করে আর্মেনিয়া, নাইজেরিয়া— বিভিন্ন দেশের মানুষের উপস্থিতিও চোখে পড়েছে শোকমিছিলের ভিড়ে । আজ খামেনির কফিন নিয়ে যাওয়া হবে পবিত্র কোম নগরীতে। বুধবার ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে শোকযাত্রা হবে নাজাফ ও কারবালা শহরে। বৃহস্পতিবার নিজ জন্মভূমিতে মাশহাদ চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন ইরানের কাণ্ডারি।






