মেসিদের তেল নেইমারদের চিনি বাংলাদেশের ঘরে ঘরে
- অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের ৫১% আসে আর্জেন্টিনা থেকে
- অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের ৫১% আসে আর্জেন্টিনা থেকে
- চিনির বাজারের ৬৫ শতাংশের বেশি আসে ব্রাজিল থেকে
- ২০২৫ সালে ব্রাজিল থেকে আমদানি ২৭২ কোটি মার্কিন ডলার
- আর্জেন্টিনা থেকে আমদানি ৭৮.৫ কোটি মার্কিন ডলার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল মানেই এক অদ্ভুত ফুটবল উন্মাদনা। দেয়ালে দেয়ালে দুই দেশের রঙ, ছাদে পতাকার লড়াই, আর চায়ের কাপে ঝড় তোলা তুমুল তর্ক-বিতর্ক। ফুটবলারদের নৈপুণ্যের কথা যেমন থাকে আলোচনায়, ললনাদের চোখজুড়ানো সাম্বা নৃত্যের তাল তেমনি তবলার বোলের মতোই ছন্দের ঢেউ তোলে ভিন্নমাত্রায় ভিন্ন আমেজে।
ফুটবল বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকা এলে এই উন্মাদনা রূপ নেয় এক আনন্দ উৎসবে। আমাদের চেনা ফুটবল দ্বৈরথের বাইরেও ল্যাটিন আমেরিকার দুই পরাশক্তির আরেকটি বড় লড়াই চলছে প্রতিদিন। সেই লড়াইটি ফুটবলের সবুজ মাঠের নয়, বাংলাদেশকে ঘিরে দুদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বিস্তার নিয়ে।
আরও সহজ করে বললে— বাংলাদেশের মানুষ যখন টেলিভিশনের পর্দায় মেসি কিংবা নেইমার জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকেন, তখন ভক্তদের অজান্তেই সকালের নাস্তা বা দুপুরের খাবারের উপাদানে থাকে দুই দেশেরই পণ্য। তবে বাংলাদেশের সয়াবিন তেলে রাজত্ব আর্জেন্টিনার। চিনির মাঠে পুরো আধিপত্য ব্রাজিলের।
৫৬ হাজার বর্গ মাইলের ছোট্ট বাংলাদেশে যখন জনসংখ্যা ১৮ কোটি, তখন ১১ লাখ বর্গ মাইলের আর্জেন্টিনায় জনসংখ্যা মাত্র ৪ কোটি ৬০ লাখ। আর ব্রাজিল তার চেয়ে অনেক বড় দেশ। ৩২ লাখ ৮৭ হাজার বর্গমাইলের হলুদ-সবুজের এই দেশের জনসংখ্যা ২১ কোটি ৩৫ লাখ। দেশের আয়তন ও জনসংখ্যার এ তথ্য আপনার মনোজগতকে রাঙাবে-ভাবাবে। বড় দুই দেশের বড় দুই অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে। কিন্তু তাদের দল ও খেলোয়াড়দের প্রতি উন্মাদনা, আবেগ, ভালোবাসায় আমরাও দৌড়াই তাদের মতো সমানতালে।
বছরে শতকোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় দেশে অন্যতম শীর্ষে থাকা মেঘনা নদীর পাড়ের মেঘনা গ্রুপ। চিনি, সয়াবিন তেলের মতো প্রধান দুটি আমদানিনির্ভর পণ্যে এ গ্রুপের মার্কেট শেয়ার সবচেয়ে বেশি। মেঘনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল এখন চীনে। ফোন করলে বললেন, ‘ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দুই দেশেরই পণ্য আমদানি করি। তবে ব্রাজিল থেকে বেশি।’ বিশ্বকাপ চলছে, আপনি ব্রাজিল নাকি আর্জেন্টিনার সমর্থক— এমন প্রশ্নে হেসে জবাব দিলেন, ‘আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নয়, আমার খেলা ব্যবসা। ব্যবসা মানেই খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, টাকার লেনদেন, অর্থনীতির সমৃদ্ধি।’
ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের ভোজ্য তেলের বাজারে তারা বছরের পর বছর চ্যাম্পিয়ন। বাংলাদেশে প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেল এবং সয়াবিন বীজ (যা থেকে স্থানীয়ভাবে তেল ও পশুখাদ্য তৈরি হয়) আমদানি হয়, তার বেশিরভাগের উৎস আকাশি-সাদার ম্যারাডোনা-মেসির আর্জেন্টিনা। অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা। দেশটির উৎপাদিত তেল জাহাজে চড়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এসে পৌঁছায় চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে।
ফুটবলে ব্রাজিলের সমর্থকরা যতই ট্রফি গুনুক না কেন, বাংলাদেশের মানুষের রান্নাঘরে প্রতিদিন আর্জেন্টিনার তেল ছাড়া গতি নেই! আবার তেল আমদানির এই প্রতিযোগিতায় ব্রাজিলের চেয়ে আর্জেন্টিনাই এগিয়ে। অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের প্রায় ৫১ শতাংশ এককভাবে রপ্তানি করে শীর্ষে আছে আর্জেন্টিনা।
ভোগ্যপণ্যের বিলিয়ন ডলারের আমদানিকারক কর্ণফুলী নদী পাড়ের টিকে গ্রুপ। এর পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার শিবলি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দুই দলের বাইরে ফ্রান্সের সমর্থক। তিনি বললেন, ‘কোন উৎস দেশ থেকে পণ্য আমদানি হবে, সেটি নির্ভর করে বেশকিছু বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে পণ্যের দাম, গুণগতমান, দেশের প্রেক্ষাপটে কতটা প্রতিযোগিতামূলক একটা বড় ফ্যাক্টর। সবগুলো বিষয় যেখানে খাপ খায়, সেখান থেকেই পণ্য আনি।’
আর্জেন্টিনার যখন এই দাপট, তখন ব্রাজিল রাজত্ব দেখাচ্ছে অন্য ক্ষেত্রে। ফুটবল ইতিহাসে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বিশ্ব জুড়ে চিনি ও ইথানল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি। আর বাংলাদেশের চিনির বাজারের প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণ পেলে-নেইমারের দেশ ব্রাজিলের হাতে।
বাংলাদেশে বার্ষিক চিনির চাহিদা ২০ থেকে ২২ লাখ টন। এর মধ্যে দেশীয় কলগুলো থেকে আসে সামান্য অংশ। বাকি চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে, যার প্রধান উৎস ব্রাজিল। বাংলাদেশের মেঘনা, সিটি, টিকের মতো বড় রিফাইনারিগুলো ব্রাজিল থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে তা প্রক্রিয়াজাত করে। ফলে বাঙালির উৎসবের পায়েস থেকে শুরু করে সকালের মিষ্টি কিংবা চা— সবখানেই ব্রাজিলের চিনির রাজত্ব। এখানে আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের ধারেকাছেও নেই।
বিশ্বকাপে ব্রাজিল সমর্থক চট্টগ্রাম চেম্বার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক। ডেল্টা অ্যাগ্রো বিজনেস নামে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা শুরু করেছেন। শুরুতে ব্রাজিল থেকে সয়াবিন বীজ আমদানি করলেও এখন আনেন আমেরিকার। তার ভাষ্য, ‘আমেরিকার কোয়ালিটি অনেক ভালো। দামও বেশ প্রতিযোগিতামূলক। জাহাজে দেশে আসতে ব্রাজিলের তুলনায় ১০ দিন বেশি লাগে। এরপরও আমেরিকাকে প্রাধান্য দিচ্ছি।’
বাংলাদেশের চিনির বাজারের ৬৫ শতাংশের বেশি ব্রাজিলের দখলে রয়েছে। অপরিশোধিত অবস্থায় এসে দেশীয় কারখানায় সেগুলো পরিশোধন হয়ে বাজারে ঢোকে।
মোস্তফা গ্রুপের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশফিকুর রহমান ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। ২ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এনেছেন ব্রাজিল থেকে। তিনি মনে করেন, ‘গুণগত মান ও খরচ বিবেচনা করে লাভের হিসাব কষেই পণ্য আমদানি হয়। অর্থনীতির বাজারে খেলার আবেগ চলে না।’
দেখে নেওয়া যাক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ডেটাবেজে ইউএন কমট্রেড কী বলছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্রাজিল থেকে প্রায় ২৭২ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। ব্রাজিল থেকে অপরিশোধিত চিনি আসে ৮৭ কোটি ডলারের। এর বাইরে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা, সয়াবীজ আমদানি হয়। ব্রাজিল বাংলাদেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম আমদানি অংশীদার।
অন্যদিকে, মোট আমদানিতে আর্জেন্টিনা অনেকটাই পিছিয়ে। ২০২৫ সালে দেশটি থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৮ কোটি মার্কিন ডলার, আমদানি শীর্ষ তালিকায় আর্জেন্টিনার অবস্থান ১৭তম। দেশটি থেকে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয় ৪৮ কোটি ডলার। বাকিটা পশুখাদ্য ও পোলট্রি শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল সয়াকেক, ভুট্টা ও গম।
দুই দেশের সঙ্গে মোট বাণিজ্যে আর্জেন্টিনার চেয়ে প্রায় তিনগুণ এগিয়ে রয়েছে বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম অর্থনীতির ব্রাজিল। রপ্তানি বাণিজ্যেও বাংলাদেশ ব্রাজিলে পাঠায় ১৮৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক পণ্য, যেখানে আর্জেন্টিনায় রপ্তানি মাত্র ২১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার।







