সংস্কারের পরও বদলায়নি জবির টিএসসি, হতাশ শিক্ষার্থীরা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে প্রায় তিন মাস আগে কেন্দ্রীয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) সংস্কারের উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জরাজীর্ণ অবকাঠামো, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নান্দনিকতার অভাবে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত এই টিএসসিকে আধুনিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব রূপ দেওয়ার আশ্বাসে স্বস্তি ফিরেছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তবে সংস্কারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও বর্তমান চিত্রে হতাশ হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী।
তাদের অভিযোগ, নতুন করে শুধু মেঝে ঢালাই ও কয়েকটি টিনের পার্টিশন নির্মাণ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
সংস্কারের আগে টিএসসির দোকানগুলো ছিল পুরনো টিনশেডের নিচে অপরিকল্পিতভাবে স্থাপিত। ভাঙাচোরা মেঝে, অপর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নান্দনিকতার অভাবে এটি দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় ছাত্রসংগঠনগুলো প্রশাসনের কাছে একটি আধুনিক টিএসসি নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছিল।
শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত তিন মাস ধরে সংস্কারকাজ চললেও কাজ প্রায় শেষের দিকে পৌঁছানোর পর দেখা যাচ্ছে, পুরনো টিনশেডের কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। দোকানগুলোর বিন্যাসেও তেমন কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। শুধু নতুন কংক্রিটের মেঝে এবং কয়েকটি টিনের পার্টিশন যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সংস্কারের পরও পুরো টিএসসির অবয়ব অনেকটাই আগের মতোই রয়ে গেছে।
এদিকে শিক্ষার্থীরা বলছেন ‘সংস্কারের ফল প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।' শিক্ষার্থীদের দাবি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি শুধু চায়ের আড্ডা বা খাবারের দোকানের স্থান নয়; এটি সাংস্কৃতিক চর্চা, সহশিক্ষা কার্যক্রম, মতবিনিময় ও শিক্ষার্থীদের সামাজিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। অথচ সেই জায়গাটিকে আধুনিক করার পরিবর্তে ন্যূনতম সংস্কারের মধ্য দিয়ে কাজ শেষ করা হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
টিএসসির অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী রকি হোসাইন বলেছেন, যে সংস্কারকাজকে ঘিরে এতদিন অপেক্ষা ছিল, তার ফলাফল প্রত্যাশার সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র-শিক্ষক মিলনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত টিএসসি শুধু খাবারের দোকান নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। আমরা ভেবেছিলাম এটি সংস্কারের পরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ উন্নতমানের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। তবে এখন যেই পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে এতে আগের তুলনায় আহামরি কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না।
একই শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী শুভ আহাম্মেদ বলেছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আঠারো হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে ভালো মানের কোনো খাবারের পরিবেশ নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটোরিয়াতে প্রয়োজনের তুলনায় জায়গা খুবই অপ্রতুল। সেই হিসেবে আমরা ভেবেছিলাম টিএসসির আধুনিকায়নের পর এই দুর্দশা কিছুটা হলেও লাগবে হবে। তবে বর্তমানে সংস্কারের যেই রূপ দেখছি এতে আসলে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এর পেছনে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ব্যবস্থাপনার অভাব ছিল বলে মনে হচ্ছে।
এদিকে বেশ কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জবির অস্থায়ী টিএসসিকে গরুর খোঁয়াড়ের সঙ্গে তুলনা করে তৈরি একটি এআই-জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করে প্রশাসনের টিএসসি আধুনিকায়নের কাজের সমালোচনা করেছেন।
অন্যদিকে এমন অপরিকল্পিত নকশার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস আমাদের একটি ডিজাইন করতে দিয়েছিল এবং আমরা সে অনুযায়ী ডিজাইন দিয়েছি। এর পরে কী হয়েছে, জানি না।
এদিকে সংস্কারকাজের ব্যয়, নকশা কিংবা প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা সম্পর্কেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কাজের মান ও পরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক নাছির উদ্দিন একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনের কথা জানালেও পরবর্তীতে সেই বিষয়ে তেমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, আমরা প্রশাসনের কাছে নকশা দেখতে চেয়েছি। কিন্তু তারা আমাদের নকশা দেখায়নি। নিজেদের মতো কাজ করেছে। এখন বর্তমানে যেই অবস্থা দেখতেছি তাতে শিক্ষার্থীদের খুব বেশি ভোগান্তি কমবে বলে মনে হয়। এখন শুধু ঢালাই করে চারপাশে ছোট ছোট ঘেরাও দিয়ে দোকান বানিয়ে দিয়েছে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেছেন, আসলে টিএসসির দোকানিরা দীর্ঘদিন ধরে টিএসসিতে দোকান করছেন। তাদের সবাইকে জায়গা দিতে গিয়ে দোকানগুলোর আকার ছোট হয়ে গেছে। তবে আমি মনে করি, দোকানের জায়গা ছোট হয়ে গেলেও টিএসসি সুশৃঙ্খলভাবে চলবে এবং টিএসসির কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। পুরো কাজ শেষ হওয়ার পরই বোঝা যাবে এটি দেখতে কেমন হয়েছে।
তিনি আরও বলেছেন, প্রত্যেক দোকানির কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়ে দোকান বরাদ্দ দেয় প্রশাসন। এই টাকা সম্পূর্ণ খরচ হয়নি সংস্কারকাজে। অবশিষ্ট টাকা আমরা দোকানিদের ফেরত দেব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্রটি সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন শিক্ষার্থীরা।






