মোবাইল আসক্তি ঠেকাতে খোকনের ‘পথ পাঠাগার’

পাঠাগারে বই পড়ছেন তরুণ-যুবকরা
চায়ের দোকানে বসে আড্ডা, রাজনৈতিক আলোচনা কিংবা মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকার চেনা দৃশ্যের বাইরে ভিন্ন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মাথাফাটা বাজারে। সেখানে চা বা কফির কাপে চুমুক দেওয়ার পাশাপাশি বই পড়ছেন তরুণ-যুবকরা। স্থানীয় উদ্যোক্তা তৌফিকুর রহমান খোকনের (২৮) কফি হাউজে গড়ে উঠেছে ‘পথ পাঠাগার’। ছোট এই পাঠাগারটি এখন এলাকার তরুণদের বই পড়ার নতুন ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
পার্শ্ববর্তী গাছগড়া গ্রামের নূর হোসেনের ছেলে তৌফিকুর রহমান খোকন (২৮)। টিউশনি ও চা-কফি বিক্রির টাকায় স্ত্রী উম্মে সালমাকে নিয়ে চলে তার সংসার।
মাথাফাটা এলাকার যুবক কাদের হোসেন বললেন, ‘কফি খাওয়ার সঙ্গে বই পড়ার মজাই আলাদা। আগে অবসর সময়ে শুধু মোবাইল দেখতাম। এখন চা বা কফি খাওয়ার ইচ্ছা হলে এখানে আসি। চা-কফি খাই, আবার বইও পড়ি। বই পড়তে পড়তে এখন আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।’
অটোরিকশাচালক মো. ছামেদুল হকের ভাষ্য, ‘বিভিন্ন চায়ের দোকানে নানা ধরনের কথা হয়। কিন্তু খোকনের কফি হাউজে এসব হয় না। এখানে এসে কফি খাই আর বই পড়ি। এমন সুন্দর ব্যবস্থা আমাদের এলাকায় তো নেইই, অন্য জায়গায়ও দেখিনি।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করে এলাকায় ফিরে আসেন তৌফিকুর রহমান খোকন। চাকরি না পেয়ে ২০১৯ সালে মাথাফাটা বাজারে ‘খোকন কফি হাউজ’ চালু করেন। ছোটবেলা থেকেই এলাকায় একটি পাঠাগার করার ইচ্ছা ছিল তার। সেই স্বপ্ন থেকে এবং তরুণদের মাদক ও জুয়া থেকে দূরে রাখতে ২০২৫ সালে কফি হাউজের এক পাশে ১৩০টি বই নিয়ে ‘পথ পাঠাগার’ চালু করেন তিনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে অনেকে তাকে বই উপহার দেন। বর্তমানে পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৩৫০টি।
পাঠাগারের তাকগুলোতে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, আত্মউন্নয়ন, ইসলামবিষয়ক বইসহ বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে। নালিতাবাড়ী থেকে ধারা হয়ে হালুয়াঘাট সড়ক দিয়ে যাতায়াতের সময় অনেক পথচারী পাঠাগারটি দেখে থামেন। কেউ চা-কফি খেতে খেতে বই পড়েন, কেউ কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে আবার যাত্রা শুরু করেন। নিয়মিত পাঠকের সংখ্যাও শতাধিক।
লালবাগ দারুল কোরআন নুরানি ও হাফেজিয়া মাদ্রাসার হাফেজ জুনায়েদ আল হাবিবের ভাষায়, ‘গ্রামের একটি চায়ের দোকানে এমন পাঠাগার সত্যিই ব্যতিক্রমী। মাদ্রাসায় সব ধরনের বই নেই। তাই শিক্ষার্থীদের নিয়ে এখানে আসি। তরুণদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহও বাড়ছে।’ অভিভাবক তোফায়েল আলম বলছিলেন, ‘আমার ছেলে এখানে প্রাইভেট পড়ে এবং বইও পড়ে। এতে তার মধ্যে ভালো পরিবর্তন দেখছি। তরুণদের মোবাইল আসক্তি কমাতে এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।’
তৌফিকুর রহমান খোকনের বর্ণনায়, ‘মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে অনেক তরুণ বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সেই চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ নিয়েছি। কেউ চা খেতে এসে অন্তত কয়েক পৃষ্ঠা বই পড়লেও সেটাই আমার বড় প্রাপ্তি। ভবিষ্যতে আরও বই সংগ্রহ করে পাঠাগারটি বড় করতে চাই।’



