বারবার হামলার শিকার পুলিশ
‘মাঠে উপস্থিত থাকতে হবে ঊর্ধ্বতনদের’
- ২০ মাসে হামলার শিকার ১০০১ জন
- পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বারবার হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশ। আসামি গ্রেপ্তার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, অপরাধ দমন কিংবা জনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো কাজে মাঠে নামলেই কোথাও পুলিশের ওপর হামলা, কোথাও অস্ত্র নিয়ে গুলি, আবার কোথাও হাতকড়া পরা আসামিকেও ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গত ২০ মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ১টি। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই ঘটেছে ৪০০টি। একের পর এক এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে— আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশই যদি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, তাহলে মাঠপর্যায়ে অপরাধ দমন ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ কতটা নির্বিঘ্নে চালানো সম্ভব?
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই প্রশ্ন আরও সামনে নিয়ে এসেছে। রাত প্রায় ৯টা। চুয়াডাঙ্গার চণ্ডীপুরে আওয়ামী লীগ নেতা আবু ছিদ্দিককে গ্রেপ্তার করে থানায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল পুলিশ। কিন্তু থানায় পৌঁছানোর আগেই পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হাতকড়া পরা অবস্থায় তাকে ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। হামলায় আহত হন দুই পুলিশ সদস্য। পরে অভিযান চালিয়ে আবু ছিদ্দিকসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
একই রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে কদলপুর ইউনিয়নে অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে পড়ে পুলিশের আরেকটি দল। এর আগে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে হকার উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তারও দুই দিন আগে আদাবরের নবোদয় হাউজিং এলাকায় আসামি ধরতে গিয়ে হামলার মুখে পড়ে পুলিশের একটি দল। ঘটনাগুলোর স্থান ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও একটি জায়গায় এসে মিলছে সবগুলো— আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা। কোথাও অপরাধী ধরতে গিয়ে, কোথাও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে, আবার কোথাও জনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের সময় আক্রান্ত হচ্ছেন সদস্যরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০ মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের ওপর ১ হাজার ১টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬০১টি এবং চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৪০০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৪২টি হামলার ঘটনা থাকলেও মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩টিতে এবং এপ্রিলে ৬৬টিতে। এরপর মে মাসে ৫৫টি, জুনে ৪৯টি, জুলাইয়ে ৪২টি এবং আগস্টে ৪১টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যানের বাইরেও রয়েছে অসৌজন্যমূলক আচরণ, হেনস্তা, মারধর ও দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অসংখ্য ঘটনা। ফলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের নিরাপত্তা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়ছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে তাদের কর্তৃত্ব ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়েও।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা শুধু রাজধানী বা কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আটটি মেট্রোপলিটন এলাকার মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ এলাকায় সবচেয়ে বেশি ৪৭টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আটটি রেঞ্জের হিসাবেও একই চিত্র। ঢাকা রেঞ্জে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৭৮টি।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের ওপর ধারাবাহিক হামলা শুধু সদস্যদের মনোবল দুর্বল করছে না, রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। তাদের মতে, হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সদস্যদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে সক্রিয় উপস্থিতি, সদস্যদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সাহস জোগানো জরুরি।
তাদের মতে, মব সংস্কৃতির বিস্তারও পুলিশের ওপর হামলার প্রবণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেছেন, পুলিশের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দায়িত্ব পালনকালে সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পেশাদারিত্ব, সংযম ও প্রয়োজন অনুযায়ী আইনসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদার মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সদস্যদের মনোবল ফেরাতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে গিয়ে তাদের উৎসাহ দেওয়া উচিত। এতে পুলিশ সদস্যরা সাহস পাবেন এবং নিজেদের অভিভাবকহীন মনে করবেন না।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বললেন, পুলিশ যেখানে মানুষকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার কথা, সেখানে পুলিশ সদস্যরাই যদি হামলার শিকার হন, তা জাতীয় জীবনের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
তার মতে, অপরাধীদের অন্যতম উদ্দেশ্য পুলিশকে ভয় পাইয়ে দিয়ে তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু পুলিশ নয়; র্যাব, এপিবিএন, পিবিআইসহ বিশেষায়িত বাহিনীগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। শক্তিশালী অপরাধী বা সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে এককভাবে অভিযান না চালিয়ে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করলে পুলিশের নিরাপত্তা বাড়বে। পাশাপাশি পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা থাকা প্রয়োজন।
চুয়াডাঙ্গার চণ্ডীপুরে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পুলিশ সুপার মেহেদী শাহরিয়ার জানিয়েছেন, হামলার পরপরই অভিযান শুরু করে পুলিশ। আটজনকে গ্রেপ্তারের পর ছিনিয়ে নেওয়া আসামি আবু ছিদ্দিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
রাউজানের ঘটনায় চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানিয়েছেন, অভিযানে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে অস্ত্র, গুলি ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। পালিয়ে যাওয়া অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
একদিকে পুলিশের ওপর হামলা হচ্ছে, অন্যদিকে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযানও চলছে। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে গ্রেপ্তার কিংবা অভিযান পরিচালনার পরও কেন বারবার আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশ— সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। বরং প্রতিটি নতুন ঘটনা পুরনো প্রশ্নটিকেই সামনে আনছে: আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা বাহিনী যদি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালন করা সম্ভব?
পুলিশের সামনে তাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অপরাধী দমন নয়; একই সঙ্গে নিজেদের নিরাপত্তা, মনোবল ও আইন প্রয়োগের সক্ষমতা ধরে রাখা। মাঠপর্যায়ে কার্যকর নিরাপত্তা, ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা, বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও আইনসম্মত ব্যবস্থা— এ বিষয়গুলোই এখন সামনে আসছে। কারণ পুলিশের ওপর প্রতিটি হামলা শুধু একজন সদস্যের ওপর আঘাত নয়, আইন প্রয়োগের পুরো ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।



