নারী নির্যাতন মামলা খারিজ
প্রভাব খাটানোর অভিযোগ দুই বিচারকের বিরুদ্ধে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নারী নির্যাতন মামলা থেকে রেহাই পেতে পদে পদে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের সাবেক বিচারক মো. ছানাউল্ল্যাহর বিরুদ্ধে। আর এ কাজে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান সহযোগিতা করেছেন— দাবি বাদী নাসরিন আক্তারের। তিনি দুই দফা মোবাইল ফোনে বাদীকে জড়িয়ে মামলা তুলে নিয়ে আপস-মীমাংসা করতে চাপ দেন। রাজি না হওয়ায় বাদীকে অন্য একটি মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে। এতেও নতি স্বীকার করেননি বাদী নাসরিন আক্তার (ছানাউল্ল্যাহর সাবেক স্ত্রী)।
তিনি গত বৃহস্পতিবার মামলার চার্জ গঠনের দিনে সুবিচার বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়ে আদালতে আবেদন জমা দেন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘আসামি একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় বাদী উচ্চ আদালতে মামলাটির বিচার পেতে আগ্রহী। উচ্চ আদালতে মামলা বদলির বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন। এ অবস্থায় চার্জ গঠনের শুনানি হলে বাদী সুবিচার বঞ্চিত হবে।’
কিন্তু ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা বাদীপক্ষের এ আবেদন আমলে না নিয়ে আসামি ছানাউল্ল্যাহকে অব্যাহতি দেন। খারিজ করে দেন মামলাটি। আদেশে তিনি বলেছেন, ‘অভিযোগপত্রে বিচার শুরুর মতো পর্যাপ্ত উপাদান না থাকায় আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।’ মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ, বাদীর অভিযোগ ও আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জানা গেছে, মামলাটির আসামি মো. ছানাউল্ল্যাহ পেশায় বিচারক। বর্তমান কর্মস্থল বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। প্রেষণে কর্মরত প্রতিষ্ঠানটির আইন অনুবিভাগের উপসচিব (আইন) হিসেবে। এর আগে ছিলেন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে। বহু ভুক্তভোগীর বিচারের রায় দেওয়া এ বিচারক নিজেই যখন সাবেক স্ত্রীর করা নারী নির্যাতন মামলার আসামি হন, তখন থেকেই রেহাই পেতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও নানা কৌশলের আশ্রয় নিতে থাকেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৩ জানুয়ারি যৌতুক দাবি ও নির্যাতনের অভিযোগে বনানী থানায় ছানাউল্ল্যাহর বিরুদ্ধে মামলা করেন তার সাবেক স্ত্রী। মামলা করার প্রক্রিয়া চলাকালে এ ঘটনায় যুক্ত হন ছানাউল্ল্যাহর সহকর্মী ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বাদীর মোবাইল ফোনে দুই দফা কল করে ২১ মিনিট কথা বলেন।
বাদীর অভিযোগ, ‘আলাপকালে তিনি মামলা না করে আপস-মীমাংসার প্রস্তাব দেন। বিনিময়ে অর্থের প্রলোভনও দেখান। বলেন, একজন বিচারকের সঙ্গে আপনি ফাইট করে পারবেন না। তার এ অনুরোধ উপেক্ষা করে মামলার পর থেকেই তিনি প্রভাব বিস্তার শুরু করেন।’
জানতে চাইলে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান শুরুতে বাদীর সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি অস্বীকার করে উল্টো এ প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্ন করেন, ‘এসব কথা কে বলল আপনাকে?’ জবাবে এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকার কথা জানলে তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘ভদ্রমহিলা আমাকে কল করেছিলেন তাই কথা হয়েছে।
একটা ডিসপিউট থাকলে কাউকে মিউচুয়াল করার কথা বলাই যায়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় নয়, ইনভেস্টিগেশন পর্যায়ে আমি কথা বলেছি। তখন মাত্র ইনভেস্টিগেশন শুরু হয়েছে। আমি অফিসপ্রধান, ছানাউল্ল্যাহ আমার আন্ডারে চাকরি করেছে। আমার আন্ডারে যারা ছিল বা আছে তাদের কোনো পার্সোনাল ইস্যুতে আমার ইনভলভ হওয়াটাই স্বাভাবিক।’
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, শুধু প্রভাব বিস্তার নয়, মামলা থেকে রেহাই পেতে প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন ছানাউল্ল্যাহ। বাদীকে ফাঁসিয়েছেন সাজানো মামলায়। গত ১৩ জানুয়ারি মামলা করার পর আপসের কথা বলে আরেক দফা বোকা বানানো হয় বাদীকে। সব মিটমাটের আশ্বাসে ফের ঘনিষ্ঠ হন। মামলা তুলে নেওয়ার শর্তে প্রতিশ্রুতি দেন সংসার করারও। কিন্তু গোপনে তিনি চলতি বছর ৭ জানুয়ারি আগারগাঁও সাব-পোস্ট অফিস থেকে বাদীকে তালাক নোটিস পাঠান। বাদীর অগোচরে তার সই জাল করে এ নোটিসের খাম ছানাউল্ল্যাহ নিজেই গ্রহণ করেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া দলিলে দেখা গেছে, সবশেষ গত ২০ এপ্রিল তালাক শুনানির হাজিরা ছিল। ওইদিন কেউ উপস্থিত না হওয়ায় সালিশ কার্যক্রম সমাপ্ত করায় তালাক কার্যকর হয়। অথচ ছানাউল্ল্যাহ মামলায় সুবিধা পেতে আদালতে যে তালাক সার্টিফিকেট জমা দেন, তা চাতুরীর মাধ্যমে তৈরি করা। গত ৩ জুন মধুবাগের একটি কাজী অফিসের বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার সাহাবুদ্দিনের ইস্যু করা সার্টিফিকেটে তালাকের দিন দেখানো হয়েছে গত বছর ৬ ডিসেম্বর। এর আগে বিয়ে রেজিস্ট্রির সময়ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন ছানাউল্ল্যাহ। নিকাহনামায় তিনি আগের স্ত্রী-সন্তান থাকার কথা গোপন করেছিলেন। বরের আগের কোনো স্ত্রী বর্তমান আছে কি না, নিকাহনামার এই ঘরে ‘নাই’ লিখে স্বাক্ষর করেন ছানাউল্ল্যাহ।
নাসরিন আক্তারের অভিযোগ, ‘ছানাউল্ল্যাহ তার ঘনিষ্ঠ রুহুল আমিন নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে আদালতে সাজানো মামলা (সি আর মামলা নং ৭৩৬/২৬) করেছেন। মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, ছানাউল্ল্যাহকে ফাঁদে ফেলে জোরপূর্বক বিয়ে করেছি। এরপর মিথ্যা যৌতুক দাবি ও মারধরের মামলা করে ছানাউল্ল্যাহর মানহানি করছি। আদালতের নির্দেশে মামলাটি এখন উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ তদন্ত করছে।’
জানতে চাইলে মামলার বাদী রুহুল আমিন বলেন, ‘এখন ছানাউল্ল্যাহর সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাই না।’
জানা গেছে, ছানাউল্ল্যাহর এ বিয়ের সাক্ষী ছিলেন দেশীয় চলচ্চিত্রের খ্যাতনামা একজন নায়ক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘দুজনের সম্মতিতেই বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর তারা তিন দিনের জন্য সিলেটের গ্র্যান্ড সুলতানে হানিমুনেও গিয়েছিলেন। বিয়ের সময়ই আমি বুঝেছিলাম লোকটা (ছানাউল্ল্যাহ) ভালো নন। তিনি যখন বিয়ের ছবি তুলতে আপত্তি করছিলেন, তখনই আমার মনে হয়েছিল তার ভেতরে কোনো ঝামেলা আছে।’
জানা গেছে, গত ৩০ এপ্রিল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশনের সাব-ইন্সপেক্টর শাহানাজ বেগম ছানাউল্ল্যাহকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেন। তাতে ছয়জনের নাম সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চার্জশিটে বলা হয়েছে, মামলার আসামি একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। অভিযুক্ত আসামির প্রথম স্ত্রী ও সেই ঘরে তিন সন্তান রয়েছে। একটি মামলার আইনি পরামর্শ চাওয়ার সূত্র ধরে বাদীর সঙ্গে অভিযুক্তের পরিচয় ও সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
একপর্যায়ে উভয়ের সিদ্ধান্তমতে গত বছর ২২ সেপ্টেম্বর তারা রেজিস্ট্রি কাবিন মূলে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে বিবাদী বিভিন্ন অজুহাতে বাদীর কাছ থেকে টাকা নিতেন। এর ধারাবাহিকতায় কিছুদিনের মধ্যেই অভিযুক্ত তাকে ব্র্যান্ডেড গাড়ি ও জমি কিনে দেওয়ার দাবি করেন। বাদী অপারগতা জানালে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে অভিযুক্ত ছানাউল্ল্যাহ ক্ষিপ্ত হয়ে বাদীকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এতে বাদী জখম হন। মামলার তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ, মেডিকেল সনদ পর্যালোচনা ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় অভিযুক্ত মো. ছানাউল্ল্যাহর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ১১ (গ) ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। প্রাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আসামিদের জবানবন্দির ভিত্তিতে তৈরি করা অভিযোগপত্রের গ্রহণযোগ্যতার শুনানি শেষে আদালত তা আমলে নেন। তবে চার্জ গঠনের দিন বিচারক বলেছেন, অভিযোগপত্রে বিচার শুরুর মতো পর্যাপ্ত উপাদান পাওয়া যায়নি। এটা অস্বাভাবিক।
জানতে চাইলে অভিযোগপত্র প্রস্তুতকারী পুলিশ কর্মকর্তা শাহানাজ বেগম বললেন, ‘অভিযোগ প্রমাণের মতো সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত অভিযোগপত্রের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখন মামলাটি কেন খারিজ করা হলো সেটা আদালতের এখতিয়ার। এ নিয়ে কথা বলতে চাই না।’
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সফিকুল ইসলাম খান সবুজ বলেছেন, ‘উপাদান না থাকলে অভিযোগ গঠনের শুনানিতে আসামি অব্যাহতি পেতে পারেন। এক্ষেত্রে বাদী চাইলে এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন।’
প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানতে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ছানাউল্ল্যাহর মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে চার্জশিট দাখিলের পর মোবাইল ফোনে আলাপকালে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘বাদী পুলিশকে ম্যানেজ করে চার্জশিট করিয়েছে। ওটার একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কারণ, চার্জশিটে গৎবাঁধা বলে দিয়েছে সবকিছু প্রমাণ হয়েছে। আসলে কিছুই প্রমাণ হয়নি।’







