ভাইকে বাঁচাতে কিডনি দিয়েছিলেন বোন, ফের সংকট

ছবি: আগামীর সময়
ভাইকে বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দিয়েছিলেন ছোট বোন। কিডনি প্রতিস্থাপনের পর দুই বছর স্বাভাবিক জীবন কাটালেও ফের জটিলতা দেখা দিয়েছে শেখ মান্নাফ হোসেন রানার শরীরে।
চিকিৎসা চালাতে গিয়ে জমিজমা, ভিটেমাটি, সঞ্চয় ও পেনশনের অর্থ ব্যয় করে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পরিবারটি। এখন ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে নিতে সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের সোনাখালী গ্রামের ৩৩ বছর বয়সী শেখ মান্নাফ হোসেন রানা দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। বর্তমানে প্রতিস্থাপিত কিডনিটির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন মান্নাফ। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার দুটি কিডনিই অকার্যকর ধরা পড়ে। প্রায় দুই বছর ডায়ালাইসিসের পর চিকিৎসকরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও ভাইকে বাঁচাতে ২৫ বছর বয়সী ছোট বোন জিনিয়া আক্তার নিজের একটি কিডনি দান করেন।
ঢাকায় চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের ব্যয় মেটাতে পরিবারের ভিটেমাটি ও জমিজমা বিক্রি করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল বাবা শেখ ইউনুস আলীর সারা জীবনের সঞ্চয় ও পেনশনের অর্থও ছেলের চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।
মান্নাফ আগে স্থানীয় মাছের আড়তে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। তার উপার্জনেই পাঁচ সদস্যের পরিবার চলত। বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন তিনি। পাসপোর্ট পাওয়ার পরই অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার সেই স্বপ্ন থেমে যায়।
কিডনি প্রতিস্থাপনের পর কিছুদিন সুস্থ ছিলেন মান্নাফ। তবে দুই বছর পর আবারও প্রতিস্থাপিত কিডনিতে জটিলতা দেখা দিয়েছে। পরিবারের দাবি, চিকিৎসকরা কিডনিটির কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন এবং ‘কিডনি রিজেকশন’র ঝুঁকির কথাও বলেছেন। চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ঢাকায় যেতে হচ্ছে তাকে। প্রতিবার যাতায়াত, পরীক্ষা ও হাসপাতালে থাকা মিলিয়ে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হচ্ছে বলে জানিয়েছে পরিবার।
মান্নাফের মা রেখা বেগম বলেন, ছেলের চিকিৎসায় জমি, সঞ্চয় ও পেনশনের টাকা— সবই শেষ হয়ে গেছে। দেশে ও ভারতে চিকিৎসা করাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এখন আর চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য নেই। ছেলে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমরা খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি। প্রতিনিয়ত চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমার ছয় বছরের নাতনি ও বৃদ্ধ মা-বাবার কথা চিন্তা করে হলেও মান্নাফকে বাঁচাতে চাই। সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষ এবং সরকারের কাছে আমার ছেলের চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা চাই।
বোন জিনিয়া আক্তার বলেন, ভাইকে বাঁচানোর আশায় নিজের একটি কিডনি দিয়েছিলাম। কিডনি প্রতিস্থাপনের পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু দুই বছর পর আবার জটিলতা দেখা দিয়েছে। তার চিকিৎসায় আমাদের জমিজমা, সঞ্চয় ও পেনশনের টাকা প্রায় শেষ। এখন চিকিৎসার খরচ বহন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। সমাজের বিত্তবান মানুষ ও সরকারের সহায়তা পেলে আমার ভাইকে আবার সুস্থ করে তোলা সম্ভব হবে।
এলাকাবাসী মনিরুল ইসলাম বলেন,মান্নাফের পরিবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা অনেক কষ্টের মধ্যে রয়েছে। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে পরিবারটি কিছুটা স্বস্তি পাবে।
মান্নাফ হোসেন রানা বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ভেবেছিলাম আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব। কিন্তু দুই বছর পর আবার জটিলতা দেখা দিয়েছে। নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। আমার ছয় বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। বৃদ্ধ মা-বাবা ও সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বাঁচতে চাই। চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সবার সহযোগিতা চাই।
ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোকনুজ জামান বলেন, মান্নাফের বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে সরকারি বিধি অনুযায়ী সহযোগিতার সুযোগ থাকলে তা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় ব্যক্তিদেরও পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।
পরিবারের পক্ষ থেকে মান্নাফের চিকিৎসার জন্য বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সরকারি সহায়তা কামনা করা হয়েছে।






