বিনামূল্যে চিকিৎসার ছয় দশক

চেম্বারে রোগী দেখছেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক প্রদ্যুৎ সাহা
বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। আগের মতো দ্রুত হাঁটতে পারেন না। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টকর। তবু রোগীর ডাক শুনলে ঘরে বসে থাকতে পারেন না তিনি। কখনো নিজের চেম্বারে, কখনো প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে গিয়ে, কখনো নিজের বাড়িতে বসেই রোগীদের চিকিৎসা দেন, তাদের সাহস জোগান। চিকিৎসার বিনিময়ে নেন না কোনো ফি।
প্রদ্যুৎ সাহা ১৯৬৪ সালে ডিএমএসএইচ পাস করেন। এরপর ১৯৭০ সাল থেকে রোগী দেখা শুরু করেন। প্রথম থেকেই তিনি বিনা ফিতে রোগী দেখেন।
৯০ বছর বয়সে ৫৬ বছর ধরে মানুষের সেবায় এভাবেই নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ডা. প্রদ্যুৎ সাহা।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চেচুড়ি গ্রামের বাসিন্দা ডা. প্রদ্যুৎ সাহা। আশির ও নব্বইয়ের দশকে তার পরিচিতি ছিল এলাকার একজন নির্ভরযোগ্য চিকিৎসক হিসেবে। তখন গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা ছিল সীমিত। অসুস্থ হলে অনেক দরিদ্র মানুষ টাকার অভাবে দূরের হাসপাতালে যেতে পারতেন না। তাদের জন্য প্রদ্যুৎ সাহার ছোট চেম্বারটি ছিল এক ধরনের আশ্রয়।
বাড়ির পাশেই তার চেম্বার। আগে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে রোগী দেখতেন। বর্তমানে ওই চেম্বারে একবেলা রোগী দেখেন। তবে কোনো রোগী বাড়িতে এলে ফিরিয়ে দেন না। বাড়িতে বসে রোগীর কথা মন দিয়ে শোনেন, দেন পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ।
রোগীরা তার কাছে শুধু চিকিৎসা নয়, মানবিক আচরণ ও সহানুভূতি পান।
তার এক ছেলে ও চার মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন।
ডা. প্রদ্যুৎ সাহা বললেন, ‘মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে আমার ভালো লাগে। জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি। এখন যতদিন শরীর চলে, মানুষের পাশে থাকতে চাই। মানুষের দোয়া ও ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
পৈতৃক সূত্রে তিনি অনেক সম্পত্তি পেয়েছেন। পৈতৃক সম্পত্তির আয় থেকে সংসার চালিয়ে যেটুকু থাকে, তা দিয়ে রোগীদের জন্য ওষুধ কেনেন।
তিনি জানালেন, এলাকার বেশিরভাগ মানুষ গরিব। তিনি মানুষের সেবা করতে চান। এজন্য রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেন না।
তার চেম্বারের পাশের চা বিক্রেতা ইমরান হোসেনের ভাষ্য, ‘ডা. প্রদ্যুৎ সাহা অনেক বছর ধরে গরিব মানুষের চিকিৎসা করছেন। এখনো মানুষ তার কাছে আসেন, আর তিনিও সাধ্য অনুযায়ী সেবা দেন।’
চিকিৎসা নিতে আসা সাবেক কলেজ শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘ডা. প্রদ্যুৎ সাহার কাছে চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষ আন্তরিকতা পান। তিনি কখনো রোগীর আর্থিক অবস্থাকে বড় করে দেখেননি। তার মতো মানুষের জন্যই গ্রামের অসহায় মানুষ বিনা টাকায় চিকিৎসাসেবা পান।’
ভবদহ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. ইকবাল হোসেনের কথায়, ‘৯০ বছর বয়সেও মানুষের সেবার প্রতি তার যে ঝোঁক, তা সত্যিই বিরল। দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাওয়া তার জীবনের বড় অর্জন।’
একসময় যিনি বাড়ি বাড়ি ছুটে রোগীর পাশে দাঁড়াতেন, বয়সের ভারে আজ তার চলার গতি কমেছে। কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। চিকিৎসার বিনিময়ে অর্থ নয়, মানুষের স্বস্তি আর কৃতজ্ঞতাকেই জীবনের প্রাপ্তি মনে করেন ডা. প্রদ্যুৎ সাহা।



