খামেনির জানাজায় কোরআনের আয়াতে কূটনৈতিক বার্তা

খামেনির জানাজায় মানুষের ঢল। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল যখন খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় উপস্থিত হয়, তখন প্রত্যেক প্রতিনিধিদলের জন্য আলাদা আলাদা কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এসব আয়াতের মাধ্যমে মিত্র, অংশীদার ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর প্রতি নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান তুলে ধরেছে ইরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় তার ১৪ মাসের নাতনি, জামাতা ও পুত্রবধূও প্রাণ হারান। এরপর তার মরদেহ তিন দিন জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রবিবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় উপস্থিত হয় বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিদল। এ-সময় তাদের উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয়।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলের জন্য সূরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত। ওই আয়াতে বদর যুদ্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ রয়েছে, যেখানে সংখ্যায় কম হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের বিজয়ের কথা বলা হয়েছে।
‘নিশ্চয় তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে দুটি দলের মধ্যে, যারা পরস্পর মুখোমুখি হয়েছিল। একটি দল লড়াই করছিল আল্লাহর পথে এবং অপর দলটি কাফের। তারা বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাদেরকে ওদের দ্বিগুণ দেখছিল। আর আল্লাহ নিজ সাহায্য দ্বারা যাকে চান শক্তিশালী করেন। নিশ্চয় এতে রয়েছে চক্ষুষ্মানদের জন্য শিক্ষা।’
বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইরান নিজেদের অবস্থানকে প্রতীকীভাবে বিজয়ী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতি এটি প্রশংসা, সতর্কবার্তা অথবা উভয়ের সমন্বিত বার্তা হতে পারে।
তুরস্কের প্রতিনিধিদলের সামনে সূরা আন-নিসার ৯৫ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়। এতে আল্লাহর পথে জান-মাল দিয়ে সংগ্রামকারীদের মর্যাদা ঘরে বসে থাকা মানুষের চেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘বসে থাকা মুমিনগণ, যারা ওযরগ্রস্ত নয় এবং নিজেদের জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীগণ এক সমান নয়। নিজেদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদকারীদের মর্যাদা আল্লাহ বসে থাকাদের উপর অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ প্রত্যেককেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং আল্লাহ জিহাদকারীদেরকে বসে থাকাদের উপর মহা পুরস্কার দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।’
বিশ্লেষকদের ধারণা, গাজা ইস্যুতে রাজনৈতিক বক্তব্য দিলেও সামরিকভাবে সরাসরি অংশ না নেওয়ার প্রেক্ষাপটে তুরস্কের প্রতি এটি প্রতীকী ইঙ্গিত হতে পারে।
হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামি জিহাদ, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং আফগানিস্তানের তালেবানের জন্য নির্বাচিত আয়াতগুলোতে শহীদদের মর্যাদা, আল্লাহর প্রতি অঙ্গীকার, দৃঢ়তা এবং বিজয়ের বার্তা তুলে ধরা হয়। হামাসের জন্য সূরা আল-আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার রক্ষাকারীদের প্রশংসা করা হয়।
‘মুমিনদের মধ্যে কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের প্রতিশ্রুতি সত্যে বাস্তবায়ন করেছে। তাদের কেউ কেউ [যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করে] তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে, আবার কেউ কেউ [শাহাদাত বরণের] প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা (প্রতিশ্রুতিতে) কোন পরিবর্তনই করেনি।’
হিজবুল্লাহর জন্য সূরা আলে ইমরানের ১৩৯ ও ১৪০ নম্বর আয়াতে প্রকৃত মুমিনদের শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
‘আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, আর তোমরাই বিজয়ী যদি মুমিন হয়ে থাক। যদি তোমাদেরকে কোন আঘাত স্পর্শ করে থাকে তবে তার অনুরূপ আঘাত উক্ত কওমকেও স্পর্শ করেছে। আর এইসব দিন আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন করি এবং যাতে আল্লাহ ইমানদারদেরকে জেনে নেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহীদদেরকে গ্রহণ করেন। আর আল্লাহ জালিমদেরকে ভালোবাসেন না।’
হুথিদের জন্য সূরা আল-ফাতহের ২৯ নম্বর আয়াতে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সাথে যারা আছে তারা কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর, পরস্পরের প্রতি সদয়, তুমি তাদেরকে রুকুকারী, সেজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, তাদের চেহারায় সেজদার চিহ্ন থাকে। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইনজিলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি চারাগাছের মত, যে তার কচিপাতা উদ্গত করেছে ও শক্ত করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় কাণ্ডের উপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা চাষিকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফিরদেরকে ক্রোধান্বিত করতে পারেন। তাদের মধ্যে যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন।’
হাশদ আল-শাবির জন্য সূরা আলে ইমরানের ১৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহর পথে নিহতদের জীবিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
‘আর যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না, বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত। তাদেরকে রিজিক দেওয়া হয়।’
ফিলিস্তিনি ইসলামি জিহাদ ও তালেবানের জন্য সূরা আল-ফাতহের প্রথম তিনটি আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, যেখানে সুস্পষ্ট বিজয়ের ঘোষণা রয়েছে।
‘নিশ্চয় আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দিয়েছি; যেন আল্লাহ তোমার পূর্বের ও পরের পাপ ক্ষমা করেন, তোমার উপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করেন আর তোমাকে সরল পথের হেদায়েত দেন। এবং তোমাকে প্রবল সাহায্য দান করেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, তালেবানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীকী স্বীকৃতি এবং ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ বিজয়ের আশাবাদও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
রাশিয়া, চীন, ভারত ও মিসরের জন্য তুলনামূলক শান্ত ও আশাবাদী বার্তাবাহী আয়াত নির্বাচন করা হয়। রাশিয়ার জন্য সূরা আল-কাসাসের ৮৩ নম্বর আয়াতে ন্যায়পরায়ণ মানুষের শুভ পরিণতির কথা বলা হয়।
‘এই হচ্ছে আখিরাতের নিবাস, যা আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করি, যারা জমিনে ঔদ্ধত্য দেখাতে চায় না এবং ফ্যাসাদও চায় না। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্য।’
চীনের জন্য সূরা আলে ইমরানের ১২৬ নম্বর আয়াতে বিজয়কে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ ও অন্তরের প্রশান্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
‘আর আল্লাহ তোমাদের জন্য তা কেবল সুসংবাদস্বরূপ নির্ধারণ করেছেন এবং যাতে তোমাদের অন্তরসমূহ এর দ্বারা প্রশান্ত হয়। আর সাহায্য কেবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে।’
ভারতের জন্য হতাশ না হয়ে দৃঢ় থাকার আহ্বানসংবলিত আয়াতের অংশ এবং মিসরের জন্য ইমানদার ও সৎকর্মশীলদের প্রতিদানের কথা উল্লেখ করা হয়।
ভারতের জন্য তিলাওয়াত করা হয় হিজবুল্লাহর জন্য তিলাওয়াত করা একই আয়াত। যেখানে বলা হয়, ‘তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না।’ তবে ভারতের ক্ষেত্রে শহীদ বা অবিশ্বাসীদের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে কেবল আশ্বস্তকারী অংশটি পাঠ করা হয়।
মিসরের জন্য তিলাওয়াত করা হয় সূরা আল-বাইয়্যিনাহর ৭ ও ৮ নম্বর আয়াত, যেখানে বলা হয়, ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তারাই সৃষ্টির শ্ৰেষ্ঠ। তাদের রবের কাছে তাদের পুরস্কার হবে স্থায়ী জান্নাত, যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা থাকবে স্থায়ীভাবে। আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন তারাও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট হয়েছে। এটি তার জন্য, যে স্বীয় রবকে ভয় করে।
কাতার, তুরস্কের মতো যুদ্ধে অংশ না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া দেশগুলোর জন্যও কৃতজ্ঞতাসূচক আয়াত তিলাওয়াত করে ইরান।
পাকিস্তানের জন্য সম্মানজনক আগমন ও প্রস্থানের দোয়াসংবলিত আয়াত তেলাওয়াত করা হয়।
‘হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সম্মানের সঙ্গে প্রবেশ করান এবং সম্মানের সঙ্গে বের করে আনুন।’
বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকাকে প্রতীকীভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের জন্য সূরা আল-বাকারার ১৪৩ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, যেখানে মুসলিম উম্মাহকে মধ্যপন্থি জাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থি উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর। আর যে কেবলার উপর তুমি ছিলে, তাকে কেবল এ জন্যই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে আমি জেনে নেই যে, কে রসুলকে অনুসরণ করে এবং কে তার পেছনে ফিরে যায়। যদিও তা অতি কঠিন (অন্যদের কাছে) তাদের ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ হেদায়েত করেছেন এবং আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের ইমানকে বিনষ্ট করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।’
বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে ইরান বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে প্রতীকীভাবে মূল্যায়ন করেছে। তবে এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে লেবাননের প্রতিনিধিদলের জন্য সূরা আন-নিসার ৬৬ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়। এতে কঠিন ত্যাগ স্বীকার ও নির্দেশ মেনে চলার প্রসঙ্গ এসেছে।
‘আর যদি আমি তাদের উপর লিখে দিতাম যে, তোমরা নিজেদের হত্যা কর কিংবা নিজ গৃহ থেকে বের হয়ে যাও, তাহলে তাদের কমসংখ্যক লোকই তা বাস্তবায়ন করত। আর যে উপদেশ তাদেরকে দেওয়া হয় যদি তারা তা বাস্তবায়ন করত, তাহলে সেটি হতো তাদের জন্য উত্তম এবং স্থিরতায় সুদৃঢ়।’
বিশ্লেষকদের ধারণা, এর মাধ্যমে ইরান লেবাননের সরকারি অবস্থানের প্রতি পরোক্ষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, খামেনির জানাজা ছিল শোকানুষ্ঠানের পাশাপাশি একটি সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক প্রদর্শনী। বিভিন্ন দেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কোরআনের আয়াত নির্বাচন করে তেহরান স্পষ্ট করেছে, কোন দেশ বা গোষ্ঠীকে তারা কতটা ঘনিষ্ঠ মিত্র, কৌশলগত অংশীদার কিংবা দূরত্ব বজায় রাখা পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে। একই সঙ্গে এ আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে ইরান যে, সাম্প্রতিক সংঘাতের পরও নিজেদের কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক অবস্থান অটুট রয়েছে বলে মনে করছে তারা।




