কোটি মানুষের অশ্রুজলে খামেনির জানাজা
বুক চাপড়ে কাঁদছে ইরান
- খামেনির প্রধান জানাজা সম্পন্ন
- আজ সবচেয়ে বড় শোকযাত্রা তেহরানে

আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রধান জানাজা সম্পন্ন। ছবি: সংগৃহীত
পাস্তুর সড়কে নিজের বাসভবন ও কার্যালয় থেকে আট কিলোমিটার দূরের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ময়দান। বিপ্লবী লাল পতাকা আর শোকের মলিন কালোর ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। কোটি কোটি মানুষের ঢল। সামনের মঞ্চে শুয়ে আছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান খামেনির প্রাণহীন শরীর। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। খানিক পরেই শুরু হবে জানাজা (স্থানীয় সময় সকাল ৮টা)। ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন হাহাকার, আর্তনাদের বাঁধভাঙা ঢেউ নেমে আসে মোসাল্লার ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে। ১০ কিলোমিটার দূরের সড়ক-ময়দানেও ওঠে কান্নার রোল। বুক চাপড়ে কান্না! প্রতিশোধের আগুনে ফুঁসে ওঠে বোবা গর্জন! ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রধান জানাজায় গতকাল শোকের সে ফুলকি-ই দেখেছে দুনিয়া। হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসের দূরদর্শনে খুব কাছ থেকেই তা পরখ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। কোটি কণ্ঠের ক্রোধের গর্জনে হয়তো আঁতকে উঠেছিল তার আগ্রাসী প্রাণও।
সাত দিনব্যাপী শোকানুষ্ঠানে গতকাল রবিবার ছিল তৃতীয় দিন। বিশ্বনেতা ও কূটনীতিকদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে নির্ধারিত শুক্রবার বাদ দিলে শোক এবং দাফন প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় দিন। তেহরানের এই মোসাল্লা চত্বরেই এদিন প্রথম জানাজা সম্পন্ন হলো খামেনির। শনিবার ছিল সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানো দিন।
আজ সোমবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শোকমিছিল হবে তেহরানে। ধারণা করা হচ্ছে, দুই কোটির বেশি মানুষ অংশ নেবেন মিছিলে। জানাজায় শরিক হতে শনিবার মধ্যরাতেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন তেহরানবাসী। জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে পুরো প্রাঙ্গণে ইরানের জাতীয় সংগীত ধ্বনিত হয়। আনুষ্ঠানিক সালাম প্রদান করেন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। মুহূর্তেই আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে পরিবেশ। জাতীয় প্রতীক ও ধর্মীয় আবহ মিলিয়ে মোসাল্লায় এক অনন্য পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয় জানাজা। আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানির ইমামতিতে শহীদ নেতা ও তার পরিবারের সদস্যদের জানাজা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক, সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার, বিদেশি প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ।
জানাজা তিন ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে শহীদ নেতার জানাজা, পরে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের, সবশেষে তার নাতনির।
জানাজা শুরু হতেই আর্তনাদে পরিণত হয় লাখো মানুষের কান্না। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সামরিক কমান্ডার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ— আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কেউই। কারও চোখে অশ্রু, কেউ বুক চাপড়ে শোকপ্রকাশ, আবার কেউ নীরবে প্রার্থনায় মগ্ন। উপস্থিত অনেকের কাছে এটি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার বিদায় নয়, তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তির মুহূর্ত।
তীব্র গরমের মধ্যেও মানুষের উপস্থিতি কমেনি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় ভিড়। আয়োজকরা পানি, ঠান্ডাপানীয় এবং চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি কুলিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়, যাতে অংশগ্রহণকারীরা কিছুটা স্বস্তি পান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরো এলাকায় নিরাপত্তা ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখে।
অনুষ্ঠানের ভেতরে রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্টভাবে উঠে আসে। জনতার কণ্ঠে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয়। ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’, ‘ইসরায়েল ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগানে বারবার মুখরিত হয়ে ওঠে মোসাল্লা।
শুধু তেহরান নয়, ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও মানুষ এই বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দেন। কেউ কেউ শত শত, এমনকি হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাজধানীতে পৌঁছান। মোসাল্লায় উপস্থিতি এতটাই ব্যাপক ছিল যে, পুরো এলাকা সারাক্ষণই জনস্রোতে পূর্ণ ছিল। জানাজা শেষ হওয়ার পরও অনেকের পক্ষে স্থান ত্যাগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শোক, কান্না এবং নীরবতা একসঙ্গে মিশে এক গভীর আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা গতকাল শুধু একটি জানাজার স্থান ছিল না; এটি ছিল শোক, রাষ্ট্রীয় সম্মান, ধর্মীয় আবেগ এবং রাজনৈতিক বার্তার এক বিশাল সমাবেশ।
আগামীকাল খামেনির কফিন নিয়ে যাওয়া হবে কোম নগরীতে। এরপর বুধবার ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে শোকযাত্রা হবে নাজাফ ও কারবালা শহরে। বৃহস্পতিবার নিজ জন্মভূমিতে মাশহাদ চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন ইরানের কান্ডারি।
লেখক: ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআইআরবির বাংলা বিভাগের সিনিয়র সাংবাদিক






