৯ গ্রামের মানুষের ফি নেন না ডা. সীমান্ত

রোগী দেখছেন ডা. সীমান্ত ওয়াদ্দার। ছবি: আগামীর সময়
শহরতলি বোয়ালখালী উপজেলার নিভৃত পল্লী সারোয়াতলী। আশির দশকের সারোয়াতলীতে ছিল না পাস করা কোনো ডাক্তার। দুয়েকজন থাকলেও গ্রামমুখী ছিলেন না। ভরসা বলতে শুধু বৈদ্য বা হাতুড়ে ডাক্তার। হোমিওপ্যাথ কিংবা পল্লী চিকিৎসক। সামর্থ্যবানরা ছুটতেন শহরে। সাধারণ মানুষ ভুগতেন রোগে-শোকে।
গ্রামেরই এক অবস্থাপন্ন গৃহস্থ সাধন ওয়াদ্দার। যাত্রাপালা, কীর্তন, পুঁথিপাঠের আসর মাতিয়ে রাখা একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ। এর সুবাদে দু’চার-দশ গ্রামের মানুষের অতি আপনজন। গ্রামবাসীর চিকিৎসার অভাব দেখতেন। অনুভব করতেন হৃদয় দিয়ে। একদিন নিজেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বুঝতে পেরেছিলেন, ওপারে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। ছোট ছেলের হাতটি শক্ত করে ধরে স্বপ্ন দেখেছিলেন তাকে ডাক্তার বানানোর। প্রত্যাশা ছিল, ছেলেটি গ্রামের মানুষকে বিনা পয়সায় সেবা দেবে।
ছয় বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট সীমান্ত ওয়াদ্দার বাবার স্বপ্ন পূরণের পথে এগোতে লাগলেন। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার মাস দেড়েক আগে জীবনপ্রদীপ নিভে যায় বাবার। বাবার স্বপ্নকে বাতাসে মিলিয়ে যেতে দেননি তিনি। বুকপকেটে গেঁথে রাখেন বাবার সেই স্বপ্ন। সীমান্ত আজ পুরোদস্তুর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। বাবার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পুরো সারোয়াতলী ইউনিয়নের ৯ গ্রামের মানুষ ধনী-গরিব কারও কাছ থেকে নেন না চিকিৎসা ফি।
বাবার স্মৃতি বুকে নিয়ে নিয়মিত ফিরে যান চেনা গ্রামে। পরম মমতায় হাত বাড়িয়ে দেন মানুষের দিকে। এ গাঁয়ের ‘পদ্মপুকুর স্কুলে’ প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেষ করে বাবার হাত ধরে সীমান্ত এসেছিলেন চট্টগ্রাম শহরে। কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৯১ সালে এসএসসি ও ১৯৯৩ সালে সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৯৩-৯৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে আছেন সীমান্ত ওয়াদ্দার। তিনি বললেন, ‘আমার জীবনে যা কিছু, সবই বাবার অবদান। আমাকে ডাক্তার বানানোর আগ্রহ ছিল তার। আমি নিজেও দেখলাম এই পেশায় মানুষের কাছে যাওয়ার সুযোগ সবচেয়ে বেশি। সৎ থেকেও সচ্ছল জীবন-যাপনের সুযোগ আছে।’
চেম্বারে রোগী এসেছেন। সীমান্ত কোনোভাবে জানলেন তার বাড়ি সারোয়াতলী। ব্যস, হাজার চেষ্টায়ও ফি দিতে পারেন না। বললেন, ‘গ্রামের মানুষকে সেবা দেওয়ার সময় বাবার কথা মনে পড়ে। আমি ডাক্তার হয়েছি। কিন্তু বাবা দেখে যেতে পারলেন না। এটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়।’
সীমান্তের ভাষ্য, ‘বাবা গ্রামের মানুষের সঙ্গে খুব বেশি অ্যাটাচড ছিলেন। গ্রামে বাবার একটা আলাদা পরিচিতি ছিল। আমাদের পাড়া-প্রতিবেশী, পাশের গ্রামের মানুষও আমাদের পরিবারের সদস্যের মতোই এখনো। আমি কি পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা দিয়ে ফি নেব? এখন গ্রামের মানুষের যেভাবে আর্থিক সামর্থ্য বেড়েছে, আগে তেমন ছিল না।’
‘স্টুডেন্ট লাইফ থেকে গ্রামের লোকজনকে হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নানা পরামর্শ দেওয়া— এগুলো করে গেছি। এমনও হয়েছে, পরদিন আমার পরীক্ষা। আগের রাত গ্রামের এক প্রসূতিকে নিয়ে হাসপাতালে কাটিয়ে দিতে হয়েছে। গভীর রাত। গ্রামের কেউ ফোন দিল। চেষ্টা করি সাধ্যমতো পরামর্শ দেওয়ার। রাতে ছুটে যেতে হয়েছে— এমন অভিজ্ঞতাও অনেক’— স্মৃতিচারণ করলেন সীমান্ত।
এমবিবিএস শেষ করে ২০০২ সাল থেকে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে লেকচারার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৬ সালে বিসিএস দিয়ে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথম পোস্টিং পান। ২০০৭ সালে বোয়ালখালী উপজেলা সদরে প্রথম চেম্বার নিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হয়ে এখন পোস্টিং সিলেটে। চট্টগ্রাম শহরেও প্র্যাকটিস করেন।
প্রায় ৫০ বছর বয়সী সীমান্ত নিজেও এখন হৃদরোগে আক্রান্ত। বললেন, ‘যতদিন বেঁচে আছি, যতদিন প্র্যাকটিস করার মতো শারীরিক সক্ষমতা থাকবে, ততদিন আমি গ্রামের মানুষকে এই সেবা দিয়ে যাব।’




