বিশ্বকাপের মুনাফায় ফিফার রমরমা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোটি দর্শক আর বিলিয়ন ডলারের টুর্নামেন্ট ঘিরে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাকে (ফিফা) সীমাহীন আয়ের প্রতীক ভাবা হলেও, এর বাস্তব আর্থিক চিত্র একেবারেই ভিন্ন। টানা তিন বছর বিশাল অঙ্কের আর্থিক লোকসান গুনছে ফুটবলের এই সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সর্বশেষ অর্থবছরেও তাদের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। আপাতদৃষ্টিতে এই ক্ষতি বিস্ময়কর মনে হলেও এটি মূলত ফিফার একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক কৌশল, যেখানে শুধু বিশ্বকাপ আয়োজনের বছরের বিপুল আয় দিয়েই সামাল দেওয়া হয় পরবর্তী তিন বছরের সব লোকসান।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ফিফা মূলত বিশ্বকাপ আয়োজনের বছরে বিপুল মুনাফা করে, যা দিয়ে পরবর্তী তিন বছরের কার্যক্রম চলে। এরপরও সংস্থাটির তহবিলে যোগ হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। সংস্থাটির সর্বশেষ ২০২২ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের বছরে মোট আয় হয়েছিল ৫৭৬ কোটি ৯২ লাখ ১৩ হাজার ডলার বা ৭০ হাজার ৯৬১ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা থেকে সব ব্যয় শেষে নিট মুনাফা হয় ২৩৬ কোটি ৭৮ লাখ ৮৩ হাজার ডলার বা ২৯ হাজার ১২৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
তবে বিশ্বকাপ-পরবর্তী সময় থেকেই অর্থাৎ ২০২৩ সাল থেকে টানা লোকসানে রয়েছে ফিফা। সংস্থাটির বিশ্বকাপ-পরবর্তী তিন বছরে (২০২৩-২০২৫ সাল) মোট লোকসান হয়েছে ১২৬ কোটি ৫২ লাখ ৭৭ হাজার ডলার বা ১৫ হাজার ৫৬২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তবে এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতির পরও ২০২২ সালের মুনাফার ১৩ হাজার ৫৬২ কোটি ৫ লাখ টাকা এখনো সুরক্ষিত রয়েছে সংস্থাটির তহবিলে।
হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ বিশ্বকাপের পর ২০২৩ সালে ফিফার লোকসান হয় ৩৯ কোটি ৫ লাখ ৩৮ হাজার ডলার বা ৪ হাজার ৮০৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এরপর ২০২৪ সালে এই লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়ে হয় ৬১ কোটি ১৯ লাখ ২৬ হাজার ডলার বা ৭ হাজার ৫২৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
এদিকে ফিফার সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব থেকে জানা গেছে, সংস্থাটির ওই বছরে ২৬ কোটি ২৮ লাখ ১৩ হাজার ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ হাজার ২৩২ কোটি ৬০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে, যা পূর্ববর্তী ২০২৪ সালের তুলনায় ৪ হাজার ২৯৪ কোটি ৯ লাখ টাকা বা ৫৭ শতাংশ কম। ২০২৫ সালে এই লোকসান কমে আসার পেছনের প্রধান কারণ ছিল ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ আয়োজন, যা থেকে ফুটবলের এই সংস্থার বড় অঙ্কের আয় হয়েছিল।
আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফিফার মোট আয় হয়েছিল ৩২ হাজার ৭৩৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় আসে টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি থেকে, যার পরিমাণ ১২ হাজার ৮৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া বিজ্ঞাপন থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৮৬৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা এবং টিকিট বিক্রি থেকে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৪৯ কোটি ১০ লাখ টাকা আয় হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোকে নিয়ে ২০২৫ সালে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ আয়োজন করে বড় আয় করলেও সংস্থাটির ব্যয় কম ছিল না। ওই বছরে ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়োজনে ব্যয় হয় ২৫ হাজার ১৩০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ আয়োজনেই সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৯০২ কোটি ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়। এ ছাড়া ফিফার ২০২৫ সালে উন্নয়ন ও শিক্ষায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার ২০০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং প্রশাসনিক খাতে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১২৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এই প্রশাসনিক ব্যয়ের মধ্যে ফিফার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনেই ব্যয় হয়েছে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১২৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
অবশ্য ধারাবাহিক আর্থিক লোকসানে থাকলেও ফিফার সম্পদের ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত। মাত্র ৫০ কোটি ৪৮ লাখ
টাকা মূলধনের ফিফার বর্তমানে ৩৩ হাজার ১৯৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকার নিট সম্পদ রয়েছে। এ সংস্থাটির কাছে গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪ হাজার ৫১৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা নগদ ছিল।
এ ছাড়া ফিফার বিভিন্ন সম্পদের মধ্যে ৭০ হাজার ৯৩৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, মানি মার্কেটে বিনিয়োগ, তৃতীয়পক্ষকে ঋণ ও ফিফার সদস্যদের ঋণ দেওয়া রয়েছে। এর বিপরীতে সংস্থাটি শুধু চুক্তি বাবদ অগ্রিম ৬৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা নিয়ে দায়ী রয়েছে। এ ছাড়া ব্যয় করেও টাকা পরিশোধ না করায় ১০ হাজার ১৭ কোটি ২৮ লাখ টাকার দায় রয়েছে।




