শোকের ময়দানে প্রতিশোধের ফুলকি
- মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জানাজা আজ

খামেনির শোক অনুষ্ঠানে লেখক ও সাংবাদিক গাজী আবদুর রশীদ
ইরানে শুক্রবার থেকেই শুরু হয়েছে দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সাত দিনের শোক অনুষ্ঠান। সেদিন থেকেই শোকের ময়দানে উড়ছে প্রতিশোধের ফুলকি। ক্ষোভের সেই স্ফুলিঙ্গই গতকাল শনিবার আগুন হয়ে ঝরে তেহরানের ‘ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা’য়। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে পুরো চত্বর। ‘ডেথ টু আমেরিকা’ ও ‘রিভেঞ্জ, রিভেঞ্জ’ স্লোগানে বজ্রপাতের মতো কেঁপে ওঠে তেহরানের আকাশ। অশ্রু নয়, সবার চোখেই যেন ‘আগ্নেয়গিরির লাভা’। শোক অনুষ্ঠানে জড়ো হওয়া কান্ডারিহারা ‘এতিম’দের একটাই দাবি— খামেনি হত্যার প্রতিশোধ চাই। হাতে ‘ইয়া লা-থারাত আল-হোসাইন (হে হোসাইনের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণকারীর)’ খচিত ঐতিহাসিক সেই লাল ব্যানার। ইরান ও শিয়া সংস্কৃতির প্রতিশোধের প্রতীক।
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জানাজা শুরু হবে আজ। কম হলেও অন্তত দুই কোটি মানুষের জোয়ার! মাইলের পর মাইলের জনসমুদ্র। ঐতিহাসিক এবিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঘর-সংসার ফেলে তেহরানে ছুটে এসেছে মানুষ। মোসাল্লা ও আশপাশের সড়ক, পার্ক, মেট্রোস্টেশন সর্বত্র লাখো লাখো শোকাহতের ঢল। ইরানের বিপ্লবী জনগণের মুখে গগনবিদারী স্লোগান মার্কবার (নিপাত যাক) যুক্তরাষ্ট্র, মার্কবার ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কবার ইসরায়েল, মার্কবার নেতানিয়াহু। আমাদের শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ আমরা নেবই! শুক্রবার ছিল শুধু বিশ্বের শতাধিক দেশের রাষ্ট্রীয় অতিথিদের শোক ও শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নির্ধারিত।
গতকাল শনিবার ভোর ৬টা থেকে গ্র্যান্ড মোসাল্লার সব দরজা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা থাকলেও মধ্যরাত থেকে জনস্রোত মোসাল্লার আশাপাশের সব সড়ক, পার্ক, মুক্তস্থান পূর্ণ হয়ে যায়। লাখো লাখো শোকাহতের অংশগ্রহণে শহীদ মুজাহিদ হজরত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনি (রহ.) এবং তার পরিবারের বিদায় অনুষ্ঠান শুরু হয়।
নজিরবিহীন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল মোসাল্লাসহ তেহরান জুড়ে। মানুষের ঢল সামাল দিতে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী এবং নিরাপত্তাকর্মীদের হিমশিম খেতে হয়। প্রতিটি গেটে নারী-পুরুষ পৃথকভাবে প্রবেশ করেন কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর। ভেতর থেকে একদল বাইরে এলে তখন বাইরের একটি দলকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। লাখ লাখ মানুষের মোসাল্লায় যাওয়া-আসার উদ্দেশ্য একটাই— প্রাণপ্রিয় ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ উজমা খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো। প্রত্যেকের হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা, ইমাম হোসাইন লেখা লাল পতাকা, হিজবুল্লাহ খচিত পতাকা, শহীদ নেতার মুষ্টিবদ্ধ ছবি সংবলিত পতাকা এবং শহীদ নেতার নানান প্রতিকৃতি সংবলিত পতাকা। লাখো কণ্ঠে মুহুর্মুহু ধ্বনিত হয়েছে শহীদ নেতার নাম। প্রত্যেক ইরানির কণ্ঠভেদী স্লোগান ছিল শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার। এ এক অবিস্মরণীয় দিনের ছবি দেখতে পেলাম। জানা নেই সূদূর অতীতে কখনো এমন শোকাহত মানুষের আহাজারির ইতিহাস আছে কি না, আগামীতেও হবে কি না!
মোসাল্লার মূল প্রাঙ্গণে উঁচু মঞ্চে রাখা আছে শহীদ সর্বোচ্চ নেতা ও তার পরিবারের কফিন। মোসাল্লার মূল প্রাঙ্গণের চারদিকে অগণিত নিরাপত্তাকর্মী গভীর সতর্কতা নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন লাখো শোকাহত মানুষকে। ওপর দিয়ে অনেক ড্রোন সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। অভূতপূর্ব, অবিস্মরণীয় হৃদয়বিদারক আজকের দিনটির ছবি হৃদয়ে গাথা থাকবে প্রত্যেক মানুষের।
ছোট ছোট শিশু, থুরথুরে বৃদ্ধ, পঙ্গু অসুস্থ নারী-পুরুষ হুইলচেয়ারে গ্র্যান্ড মোসাল্লায় এসে শহীদ রাহবারের (সর্বোচ্চ নেতা) জন্য আহাজারি করছেন। মোসাল্লার মূল শোক মঞ্চ থেকে মর্সিয়া, শোকগীত ও নানা স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। সেই স্লোগানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে সব নারীর কণ্ঠে ঢেউয়ের মতো ভেসে আসছে মার্কবার আমেরিকা, মার্কবার ইসরায়েল, মার্কবার ট্রাম্প, মার্কবার নেতানিয়াহু। আমাদের শহীদের রক্তের প্রতিশোধ নেবই নেব। নারী কণ্ঠের স্লোগানের ঢেউ বিলীন হওয়ার আগেই পুরুষ কণ্ঠে সেই একই সুর আকাশকে প্রকম্পিত করেছে। এ ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হতে পেরে ভাগ্যবান মনে হয়েছে নিজেকেও।
প্রচণ্ড গরমে মানুষের ছাতি ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থায় ঠান্ডা পানির বোতল নিয়ে তৃষ্ণার্ত আহাজারি করা মানুষের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী। পুরো প্রাঙ্গণের ওপর থেকে ঝরনা দিয়ে পানি ছিটানো হচ্ছে শোকার্ত মানুষকে একটু স্বস্তি দিতে।
মূল প্রাঙ্গণ থেকে আবার কিছুক্ষণের জন্য মোসাল্লার চারদিকের বিশাল ভবনের খোলা জায়গায় এসে একটু বিশ্রাম করে নিচ্ছেন নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশুসহ সবশ্রেণির মানুষ। যারা মধ্যরাতে এসেছেন তারা ফ্লোরে ঘুমিয়ে পড়েছেন বুকে ইরানের পতাকা নিয়ে। এ এক অনন্য ছবি। দেশপ্রেম, নেতার প্রতি ভালোবাসা এত গভীর হতে পারে, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা সত্যিই কষ্টকর। হয়তো আজকের মোসাল্লায় শহীদ রাহবারের প্রতি লাখ লাখ শোকাহত মানুষের এই ছবি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েল বুঝতে পারত, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে আর কখনো ইরানের ওপর আগ্রাসন চালানোর কথা মাথায় আনত না। আজ, কাল ও পরশুর জানাজা, শ্রদ্ধা নিবেদন এবং শোক মিছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইরানি জনগণের ঐক্যের প্রতীক। শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শপথের বার্তা।
শহীদ ইমাম মুজাহিদ আয়াতুল্লাহ আল-উজমা খামেনির (কুদ্দিসা সিররুহু) শাহাদাত উপলক্ষে গঠিত স্মরণ কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী, তেহরান সময় আজ সকাল ৮টায় শুরু হবে জানাজা।
এরপর ৬ জুলাই তেহরানে, ৭ জুলাই পবিত্র কোম শহরে এবং ৯ জুলাই মাশহাদে শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। পরে ইমাম রেজার (আ.) পবিত্র মাজারে দাফন সম্পন্ন হবে।
লেখক: রেডিও তেহরানের সদ্য সাবেক সাংবাদিক ও উপস্থাপক





