মানুষের তৃষ্ণা মেটাচ্ছেন রাসেল

দুর্যোগে খাবার পানি নিয়ে ট্রলারে রাসেল। ছবি: আগামীর সময়
অতিমাত্রায় লবণাক্ততা আর আর্সেনিকের কারণে উপকূলীয় জনপদ বাগেরহাটের শরণখোলায় নদী, খাল, পুকুর এবং নলকূপের পানি পান তো দূরের কথা; দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারেরও অনুপযোগী। বিশেষ করে, শুকনো মৌসুমে ভয়াবহ আকার ধারণ করে খাবার পানির সংকট।
এ অবস্থায় মানুষের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে এসেছেন রাসেল আহমেদ (৩৮) নামের এক যুবক। যে কারণে দূর হয়েছে উপজেলার চার গ্রামের মানুষের সুপেয় পানির কষ্ট।
রাসেল আহমেদ বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি দুর্যোগ-দুঃসময়েও অসহায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ছুটে যান ড্রাম, কনটেইনারভর্তি পানি আর খাদ্যসামগ্রী নিয়ে।
উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের সুন্দরবন-সংলগ্ন শরণখোলা, খুড়িয়াখালী, সোনাতলা ও চালিতাবুনিয়া— এই চার গ্রামে বহু বছর ধরে চলছিল খাবার পানির হাহাকার। শুকনো মৌসুমে পুকুর-নদীর পানিই ভরসা ছিল এলাকার মানুষের। ছোট পুকুরগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় দূরদূরান্তের সরকারি পুকুর এবং এলাকার ব্যক্তিমালিকানার কিছু বড় পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করে তাতে ফিটকিরি দিয়ে পান করতে হতো। নারী ও শিশুরা এক কলস পানির জন্য ছুটত মাইলের পর মাইল। স্কুল-পড়াশোনা বাদ দিয়ে পানির পেছনে ছুটতে হতো শিশুদের।
এ পরিস্থিতিতে খুড়িয়াখালী গ্রামের যুবক রাসেল আহমেদ নিজের পরিবারের পানির সংকট মেটাতে গিয়ে এলাকাবাসীর কথাও ভাবতে শুরু করেন। তাদের বাড়ির পুকুর থেকে পানি নিয়ে পান করতেন এলাকাবাসী। কিন্তু চৈত্র-বৈশাখ মাসে বেশি পানি থাকত না সেই পুকুরে। ২০১৯ সালে প্রায় ১ কিলোমিটার পাইপলাইন টেনে ইলেকট্রিক মোটরের মাধ্যমে সরকারি একটি পুকুর থেকে তাদের পুকুরে পানি এনে সংরক্ষণ শুরু করেন। সেই পানি নিতে থাকেন এলাকার মানুষ। কিন্তু রাসেল ভাবছিলেন তার বাড়ির পুকুরে যদি একটি ফিল্টার স্থাপন করা যায়, তাহলে বিশুদ্ধ পানি পেতে পারেন এলাকাবাসী।
২০২১ সালে তার সে স্বপ্নপূরণে এগিয়ে আসে উন্নয়ন সংস্থা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। তার পুকুরে একটি পন্ড স্যান্ড ফিল্টার স্থাপন করে দেয় সংস্থাটি। এরপর থেকে বিশুদ্ধ পানি পেতে শুরু করেন এলাকাবাসী। কিন্তু একটি ফিল্টারে যে পরিমাণ পানি বিশুদ্ধ হয়, তা দিয়ে চার গ্রামের মানুষের চাহিদা পূরণ হচ্ছিল না। পরে ২০২৩ সালে ডু সামথিং নামে আরেকটি সংস্থা বড় পরিসরে রিভার্স অসমোসিস (আরও) ফিল্টার স্থাপন করে সেখানে। রাসেলের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এখন প্রতিদিন চাহিদামতো বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে পারছেন ওই চার গ্রামের দেড় হাজার পরিবারের প্রায় ছয় হাজার মানুষ।
শরণখোলা গ্রামের তাজিনুর বেগম, রেকসোনা বেগম ও কাজল বেগম বলছিলেন— ‘এক কলস পানির লাইগা মোরা যে কত কষ্ট করছি, তা বইলা বুঝাইতে পারমু না। পোলা-মাইয়ারে স্কুলে না পাঠায়াই পানি আনতে পাঠাইছি। কয়েক মাইল দূরের সরকারি পুকুর দিয়া পানি আইনা তা ফেটকুরি (ফিটকিরি) দিয়া খাইছি। রাসেলের বাড়ি ফিল্টার বসানোর পর এহন আর আগের মতো পানির কষ্ট নাই। রাসেল আমাগো খাবার পানির কষ্ট মিটাইয়া দিছে।’




