জার্মানির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউরোপের প্রথম ইসলামি ধর্মশিক্ষা অনুষদ

নতুন অনুষদের প্রথম ডিন মৌহানাদ খোরশিদে। ছবি: সংগৃহীত
জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মুনস্টারে নির্মাণাধীন ‘ক্যাম্পাস অব রিলিজিয়ন্স’ প্রকল্প এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের উদ্বোধন হওয়ার কথা ২০২৭ সালে। সেখানে ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট ও ইসলামি ধর্মশিক্ষার বিভাগ এবং ধর্মবিষয়ক গবেষণার বিভাগকে একসঙ্গে আনা হবে। তবে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার আগেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস গড়েছে মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়।
১ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইসলামি ধর্মশিক্ষা কেন্দ্র পেয়েছে পূর্ণাঙ্গ অনুষদের মর্যাদা। এর ফলে জার্মানি তো বটেই, ইউরোপের মধ্যে প্রথমবার কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র ইসলামি ধর্মশিক্ষা অনুষদ প্রতিষ্ঠিত হলো।
গত ১৫ বছর ধরে মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছেন ইসলামি চিন্তাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী মৌহানাদ খোরশিদে। ৫৪ বছর বয়সি এই শিক্ষক বলেন, ইতিহাসের একটি বিশেষ মুহূর্তের অংশ হতে পেরে গর্বিত তিনি। তবে এর সঙ্গে বড় দায়িত্বও জড়িয়ে আছে। তার ভাষ্য, এই অনুষদের মাধ্যমে উদার, আধুনিক ও মুক্তচিন্তার ইসলামের ধারণা তুলে ধরতে চান তারা। এর প্রভাব শুধু ইউরোপেই নয়, মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও পড়তে পারে।
এতদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি ধর্মশিক্ষা কেন্দ্রের পরিচালক ছিলেন তিনি। এখন দায়িত্ব নিয়েছেন নতুন অনুষদের প্রথম ডিন বা প্রধান হিসেবে। নতুন মর্যাদা পাওয়ার ফলে অনুষদটি এখন নিজস্বভাবে গবেষণা পরিচালনা করতে পারবে এবং উচ্চতর ডিগ্রি দিতে পারবে। এতে নতুন গবেষক ও শিক্ষক তৈরির পথ আরও সহজ হবে। পাশাপাশি গবেষণার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থসহায়তা পাওয়ার সুযোগও বাড়বে।
খোরশিদে জানান, ২০১২ সালে যখন কেন্দ্রটি চালু হয়, তখন সেখানে ছিলেন মাত্র ১৫ জন শিক্ষার্থী ও তিনজন কর্মী। এখন সেখানে কাজ করছেন আটজন অধ্যাপক এবং ৫০ জনের বেশি কর্মী। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে বলেও আশা করছেন তিনি।
এর একটি বড় কারণ হলো, জার্মানির বিভিন্ন সরকারি স্কুলে ধীরে ধীরে চালু করা হচ্ছে ইসলামি ধর্মশিক্ষা। ফলে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। মুনস্টার যে উত্তর রাইন-ভেস্টফালিয়া রাজ্যে অবস্থিত, সেখানে প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার শিক্ষক। অথচ বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ৩৩০ জন। ফলে এই অনুষদের শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও অনেক।
শুধু শিক্ষকতাই নয়, আরও নানা ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি করতে চায় বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২৭ সাল থেকে ‘ইসলাম ও সমাজসেবা’ নামে একটি স্নাতকোত্তর কোর্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। যুবকল্যাণ, হাসপাতাল, প্রবীণদের সেবা এবং ধর্মীয় পরামর্শদানের মতো ক্ষেত্রে এই কোর্সের চাহিদা থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অনুষদের নীতিমালায় বলা হয়েছে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও গণতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে। কোরআনকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পড়া, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো এবং মুক্তচিন্তার চর্চাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে চরমপন্থা, ইহুদিবিদ্বেষ ও ধর্মের নামে রাজনৈতিক উগ্রতার বিরোধিতা করা হবে। ধর্মের নামে সহিংসতা বা মানুষকে ভুল পথে প্রভাবিত করার যেকোনো প্রচেষ্টারও বিরোধিতা করবে অনুষদ।
নতুন অনুষদের খবর প্রকাশের পর আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও এটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ার কথাও উল্লেখ করেন খোরশিদে। তার মতে, অনেক মানুষ উদার ও আধুনিক ইসলামের চর্চা দেখতে চান। ভবিষ্যতে মুনস্টার সেই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র নরবের্ট রোবার্স বলেন, মুনস্টার দীর্ঘদিন ধরেই ধর্মীয় শিক্ষা ও গবেষণার জন্য পরিচিত। এবার প্রথমবারের মতো দুই খ্রিস্টান ধর্মশিক্ষা অনুষদ এবং ইসলামি ধর্মশিক্ষা অনুষদ একই ছাদের নিচে কাজ করবে। একই গ্রন্থাগার ও খাবারঘর ব্যবহার করবে তারা। তার মতে, এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী মূল্য রয়েছে।
ইউরোপে ইসলামি ধর্মশিক্ষার অনুষদ আগে সারায়েভোতেও ছিল। তবে সেটি কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ নয়। সেই কারণে মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগকে ইউরোপে প্রথম বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এর শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব রয়েছে।
জার্মানির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী আনেটে শাভান, যিনি ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন, এই পদক্ষেপকে উল্লেখ করেছেন একটি বড় মাইলফলক বলে। জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামি ধর্মশিক্ষা চালুর ক্ষেত্রে তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তার মতে, নতুন এই অনুষদ শুধু ইসলামি শিক্ষা নয়, সামগ্রিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষা ও গবেষণাকেও আরও শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যতে ইউরোপজুড়ে স্বীকৃতি পাবে।
ভাষান্তর: রুবাইয়া জেসমিন, কলকাতা প্রতিনিধি




