‘ছিনতাইকারী’ আখ্যা দিয়ে যুবককে হত্যা
‘এক লাখ টাকার জন্য আমার চোখের সামনে আমার বাবাডারে মারছে!’

সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় সিজানের মা। ছবি: আগামীর সময়
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সিজান নামে এক যুবককে ‘ছিনতাইকারী’ আখ্যা দিয়ে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৪ জুলাই) রাতে পশ্চিম মাসদাইর এলাকার ঘটনা এটি। এ ঘটনায় স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও মসজিদের ইমামের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে নিহতের পরিবার।
রবিবার (৫ জুলাই) ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এ সময় বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন নিহত সিজানের মা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়ার সময় তারা বলে, এক লাখ টাকা দেন, আমরা বিচার কইরা ছাইড়া দিমু। তারা আমার পোলারে আমার চোক্ষের সামনে মাইরা এক লাখ টাকা চাইছে। আমি কইছি, আমার পোলাডারে মাইরেন না, আমি আফনেগো এক লাখ টাকা জোগাড় কইরা দিমু, যেমনেই পারি। আমি দিতে পারি নাই দেইখা, আমার চোক্ষের সামনে আমার বাবাডারে মারছে।’
নিহতের বাবা ইউনুছ ওরফে ইনু মিয়ার অভিযোগ, স্থানীয় আল ফালাহ সমাজ কল্যাণ সংগঠনের সভাপতি এবং একটি মসজিদের ইমাম কাওছার আহমেদের নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৪০ জন কিশোর ও যুবক শনিবার রাত ৮টার দিকে সিজানকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যান। পরে পশ্চিম মাসদাইর মোড়ে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। তার ভাষ্য, সিজানের ডান পায়ে পাইপ দিয়ে আঘাত করে ভেঙে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়লে হাতের বাঁধন খুলে চিকিৎসার জন্য নিতে বলা হয়। পরে খানপুর হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
অভিযুক্ত কাওছার আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, সিজানের বিরুদ্ধে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। তাকে বোঝানোর জন্য বাসা থেকে আনা হয়েছিল, যাতে সে খারাপ কাজ ছেড়ে দেয়। তবে এ সময় কিছু উত্তেজিত লোকজন তাকে মারধর করে। তার দাবি, যারা মারধর করেছে তারা তার লোক নয়।
এদিকে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কাওছার আহমেদকে বলতে শোনা যায়, ‘যার কাছে যা আছে তা নিয়ে নেমে যেতে হবে। ঐক্য থাকলে, বাংলাদেশের প্রশাসন কি, কোনো কুত্তায়ও আমাদের কিছু করতে পারবো না। পাবলিক যদি কোনো কুত্তার মেরে ফেলে তাহলে কি অন্যায় হবে? ইনশাল্লাহ কোনো মামলা হামলা কিচ্ছু হবে না। এভাবে সবাই এক থাকবেন।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক মাস আগে পশ্চিম মাসদাইরের আল ফালাহ মসজিদের নাম অনুসারে ‘আল ফালাহ সমাজ কল্যাণ সংগঠন’ গঠন করা হয়। সংগঠনটির সভাপতি কাওছার আহমেদ এবং সাধারণ সম্পাদক এনায়েতনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জুম্মান। মাদক, চুরি ও ছিনতাই প্রতিরোধের লক্ষ্য নিয়ে সংগঠনটি যাত্রা শুরু করলেও স্থানীয়দের দাবি, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজনের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনের পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করা জিলানি ফকিরের বিরুদ্ধেও ফতুল্লা মডেল থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
রবিবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আল ফালাহ সমাজ কল্যাণ সংগঠন। সভাপতি মুফতি কাওছার কাসেমী মন্তব্য করেন, ‘নিহত সিজান এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী ও ছিনতাইকারী ছিলেন এবং তার কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ ছিল। তাকে সংশোধনের জন্য আগে বহুবার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি ‘বায়তুস সাকাফাহ সমাজ কল্যাণ সংগঠন’-এর সহযোগিতায় তাকে ৪০ দিনের চিল্লাতেও পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু ফিরে এসে সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।’
তার দাবি, শনিবার মাগরিবের নামাজের সময় বিক্ষুব্ধ জনতা সিজানকে ধরে তাদের কাছে নিয়ে আসে। তারা নামাজ শেষে বিষয়টি দেখার কথা জানিয়ে মসজিদে যান। এ সময় উত্তেজিত জনতা তাকে মারধর করে। পরে তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে সিজানের মা অনুরোধ করায় মুচলেকা নিয়ে তাকে সুস্থ অবস্থায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, সিজানের কাছ থেকে সুইচ গিয়ার ও মাদকদ্রব্য পাওয়া গিয়েছিল। তার মৃত্যুর পর সংগঠনের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
সংগঠনের নেতা জিলানি ফকির মন্তব্য করেন, ‘সিজানকে মারধরের যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে তাদের কোনো সদস্য জড়িত ছিলেন না। তারা তখন নামাজে ছিলেন এবং বহিরাগত ক্ষুব্ধ লোকজনই মারধর করে থাকতে পারে।’
অন্যদিকে সংগঠনের নেতাদের দাবি, সিজানকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পর তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বড় ভাই বাবুর নেতৃত্বে একটি কিশোর গ্যাং তাদের কার্যালয় ও আশপাশের দোকানপাটে ভাঙচুর চালায়। এর প্রতিবাদে তারা এলাকায় মিছিলও করেন। তাদের ভাষ্য, তারা সবসময় আইন মেনে কাজ করেন এবং অতীতেও অপরাধীদের ধরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছেন। এ ঘটনাতেও একই চেষ্টা করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তারা সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুব আলম জানান, ‘মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত চলছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা রুজু করা হবে।’
সর্বশেষ রবিবার রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত নিহত সিজানের মা ফতুল্লা মডেল থানায় অবস্থান করছিলেন। এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল।




