সাহেবদের ‘গ্র্যান্ড এরিয়া’ বাঙালির ‘গেন্ডারিয়া’

১৮০০ সালের উইরি স্ট্রিটের (বর্তমানে ওয়ারী) একটি বাড়ি। ছবি: এআই
ঢাকার অলিগলিতে খুঁজলে মিলবে অজস্র নাম, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে ৪০০ বছরের ইতিহাস। একটা সময় ছিল যখন এই শহরের রাস্তাগুলো চিনত সাহেবদের নামে, নবাবদের কীর্তিতে কিংবা সিনেমা হলের জৌলুশে; এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, সেই পুরনো নামগুলোই লোকমুখে রূপ বদলে হয়ে গেছে নগরবাসীর নিজস্ব সম্পত্তি। সেই বদলে যাওয়ার গল্প লিখেছেন শম্পা বিশ্বাস
‘ভাই, বীরউত্তম কে এম শফিউল্লাহ সড়ক যাব’— কারওয়ান বাজার মোড়ে দাঁড়িয়ে কোনো রিকশাচালককে এই কথা বললে তিনি হয়তো হাঁ করে তাকিয়ে থাকবেন! কিন্তু যখনই বলবেন, ‘গ্রিন রোড যাব’— অমনি চালক সহাস্যে বলে উঠবেন, ‘আসেন আসেন, আগে কইবেন তো গ্রিন রোড যাইবেন!’
এই যে ঢাকার রাস্তার নতুন নাম আর লোকমুখের পুরনো অভ্যাসের দ্বন্দ্ব, এটাই ঢাকাকে আর দশটা শহর থেকে আলাদা করেছে। নতুন প্রজন্ম কেতাবি নামগুলো মুখস্থ করলেও প্রবীণরা এখনো সেই পুরনো স্মৃতি হাতড়েই পথ চলেন।
৪০০ বছরের পুরনো ঢাকা শহরের অলিগলি, রাস্তা আর মহল্লার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ইতিহাস। সময়ের স্রোতে বা মানুষের মুখের ভাষার পরিবর্তনে বদলে গেছে ঢাকার বহু রাস্তার নাম। তবুও ঢাকার রাস্তার এ নামকরণের বিবর্তন যেন এ শহরেরই রূপান্তরের এক জীবন্ত দলিল।
গল্পটা শুরু করা যাক ঢাকার বনেদি অঞ্চল গেন্ডারিয়া দিয়ে। ব্রিটিশ আমলে সুপরিকল্পিত অভিজাত এলাকাটির নাম ছিল ‘গ্র্যান্ড এরিয়া’। কিন্তু খাস ঢাকাইয়াদের মুখে কি আর অত ইংরেজি বোল ফোটে? তারা নিজেদের সুবিধামতো ‘গ্র্যান্ড এরিয়া’কে বানিয়ে নিল ‘গেন্ডারিয়া’। তেমনিভাবে সে সময় স্কটল্যান্ড থেকে আসা বণিক ও ধর্মপ্রচারকদের থাকার জায়গাকে স্থানীয় বাঙালিরা ‘স্কটল্যান্ড’ বা ‘স্কটিশ’ নামে ডাকতে চেষ্টা করত। কিন্তু ইংরেজি উচ্চারণের সমস্যার কারণে ‘স্কটল্যান্ড’ শব্দটি বিকৃত হয়ে আজকের ‘ইস্কাটন’।
আবার ব্রিটিশ আমলে কৃষি গবেষণার জন্য যেখানে বিশাল খামার বা ফার্ম ছিল, কালক্রমে ওই এলাকার নাম হয়ে যায় ‘ফার্মগেট’। এমন আরও কত নাম! সচিবালয়ের পেছনের যে রাস্তা দিয়ে আজ বড় বড় গাড়ি সাঁই সাঁই করে ছুটে যায়, মোগল আমলে সেই তোপখানা রোডে রাখা হতো কামান (তোপ) আর বারুদ। সময়ের বিবর্তনে কামান গেছে জাদুঘরে, কিন্তু ‘তোপখানা’ নামটা রয়ে গেছে ইতিহাসের স্মারক হয়ে।
ঢাকার কিছু রাস্তার নাম এসেছে সাহেবদের নামের বিকৃতি থেকে। যেমন, ওয়ারী। ১৮৮৪ সালে ঢাকার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার উইরির নামানুসারে যে এলাকার নাম উইরি ছিল, আজ তা রূপ নিয়েছে ওয়ারীতে। তেমনি মিস্টার বুথের নাম থেকে এসেছে ভূতের গলি। আর কাকরাইল হয়েছে মিস্টার ককরেলের নাম থেকে।
ফার্মগেট-সংলগ্ন ইন্দিরা রোডের নামকরণের ইতিহাসটি নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নামানুসারে এ রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। আসলে তা নয়। ব্রিটিশ আমলে ঢাকার তেজগাঁও অঞ্চলের জমিদার দ্বিজেন বাবু তার নিজস্ব জমিতে তৈরি রাস্তার নামকরণ করেন কন্যা ইন্দিরার নামে। মেয়ের জন্য বাবার ভালোবাসার নিদর্শন আরও আছে। নবাব আহসান উল্লাহ তার মেয়ে পরীবানুর নামে একটি বাগানবাড়ি তৈরি করেছিলেন। সেই পরীবানুর বাগান থেকেই কালক্রমে এলাকা ও রাস্তার নাম হয়ে যায় পরীবাগ।
পরীবাগে আসলে কোনো পরী নেই। তেমনি হাতিরঝিল বা হাতিরপুলেও হাতি নেই। নবাবদের আমলে রাজকীয় হাতিদের গোসল ও পানি খাওয়ানোর জন্য যে জলাভূমিতে আনা হতো কালক্রমে সেটিই হাতিরঝিল এবং হাতিগুলোর যাতায়াতের সুবিধার্থে মাঝপথে যে পুল বা সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটিই হাতিরপুল নামে পরিচিতি। আবার মোগল আমলে কাফেলা বা পর্যটক থামার প্রধান আস্তানা ‘কারওয়ান’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কালক্রমে এই কাফেলার লোকেদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে যে বাজার গড়ে ওঠে, তার নাম হয় ‘কারওয়ান বাজার’। কেউ কেউ একে কাওরান বাজারও বলে থাকেন। তবে অভিজাত গুলশানকে এখন আর কেউ ভোলা গ্রাম বলে না।
ঢাকার কিছু এলাকার নামকরণ হয়েছে সিনেমা হলের নামে। যেমন মিরপুর রোডের ব্যস্ত এলাকা ‘শ্যামলী’র নামকরণের পেছনে জড়িয়ে আছে শ্যামলী সিনেমা হল। রাজমণি সিনেমা হলের কারণে কাকরাইলের একটি নির্দিষ্ট মোড়কে মানুষ ‘রাজমণি মোড়’ নামে চেনে। আজকের ঢাকার অন্যতম ব্যস্ততম কেন্দ্র ‘গুলিস্তান’-এর নামও কোনো সরকারি পরিকল্পনার অংশ নয়। ১৯৪৭ সালে কলকাতার চিত্র ব্যবসায়ী খান বাহাদুর ফজল আহমদ ঢাকায় এসে ‘লিবার্টি’ নামে একটি সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৩ সালে এর নাম বদলে রাখা হয় ‘গুলিস্তান সিনেমা হল’। তখন এই হলের জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, মানুষ পুরো এলাকাটিকে ‘গুলিস্তান’ নামে ডাকতে শুরু করে।
আবার স্বাধীনতার পর ঢাকার বহু রাস্তার নাম পরিবর্তন করে বীর মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাশহীদ এবং বরেণ্য ব্যক্তিদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। উদাহরণ, গ্রিন রোড। বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান বীরউত্তম মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউল্লাহর নামে সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে। একইভাবে গ্রিন রোডের একটি অংশের বর্তমান নাম ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী সড়ক’। অন্যদিকে টেকনিক্যাল মোড় থেকে ধানমন্ডি অভিমুখী প্রধান সড়কটির একাংশের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সরণি’। তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাস্তার নামকরণে ইতিহাসের স্মারক যেমন জরুরি, তেমনি নামকরণের পর তা ফলক বা সাইনবোর্ডের মাধ্যমে দৃশ্যমান করাও প্রয়োজন যাতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে কোনো বিভ্রান্তি না তৈরি হয়।
আসলে ঢাকা এমন এক শহর, যা প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলায়। এই বদলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সাক্ষী এখানকার রাস্তাগুলো। তাই কালের গর্ভে কোনো রাস্তার নাম হারিয়ে যাক বা নতুন নামে উজ্জ্বল হোক; ঢাকার এ পথগুলো আসলে এই শহরেরই বদলে যাওয়ার গল্প বলে।





