রাজনীতি কি আমারে ভাত দিব?

মহাখালীর একটি ফুটপাতে সন্তোষ
‘সন্তোষ, আপনার বয়স কত?’
‘ঠিক জানি না। সত্তরের মতো হইতে পারে।’
ধূসর দৃষ্টি সন্তোষের চোখে; জীবনে বেঁচে থাকার প্রত্যেকটি রেখা যেন স্পষ্ট দেখা যায় ভীষণ শীর্ণ শরীরে। চারপাশে ধাবমান উন্মত্ত শহর। দানবের মতো মাথা তোলা ঘরবাড়ি, বাণিজ্যিক কার্যালয়গুলোর দরজায় আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো মানুষ। এই শহরের কত কী বদলে গেছে তার চোখের সামনে। শহরের ভৌগোলিক সীমানা পাল্টেছে, মানুষের শ্রেণি-চরিত্র বদলেছে। বৃক্ষকে বিদায় দিয়ে তৈরি হয়েছে ঝকঝকে ফুটপাত। দিনের বেলা ব্যস্ত শহর থেকে সন্ধ্যায় আলো জ্বেলে বেঁচে থাকা শহরটা মনে হয় পাল্টে নিয়েছে তার নিজের নিয়তি।
জানতে চেয়েছিলাম, এই বদলে যাওয়া শহর কেমন লাগে আপনার? এই ঝকঝকে আলো, উঁচু উঁচু বাড়ি, পথে স্রোতের মতো বয়ে চলা দামি গাড়ির মিছিল দেখে কী ভাবেন এখন? উত্তরে সন্তোষ বললেন, ‘সব বদলাইলে কী হইব? আমার তো কিছু নাই; আমি যা আছিলাম তাই আছি।’
সব পাওয়ার জন্য কোনোদিন পথে মিছিল করতে ইচ্ছা করেনি, মুষ্টিবদ্ধ হাত ওপরে তুলে প্রতিবাদের তীব্র আঘাতে এই অচলায়তন ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করেনি আপনার? সন্তোষ কি আদতেই বোঝেন অচলায়তন শব্দটার মানে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকে নন্দিনী রাজার অচলায়তন ভাঙতে চেয়েছিল। সন্তোষের কাছে সেই অচলায়তনেরইবা অর্থ কী?
আজও তাকে প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে এই রাজধানী ঢাকার বেরাইদ অঞ্চলের গভীরে কোনো গ্রাম থেকে কিছুটা পথ টেম্পো, তারপর বাসে চড়ে পৌঁছাতে হয় মহাখালী এলাকায়। একটানা ত্রিশ বছর ফুটপাতের ধারে বসে অন্যের জুতা সেলাই করেন সন্তোষ। হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠোকেন, তার দুর্বল হয়ে আসা আঙুল শক্ত সুতা দিয়ে সেলাই করে জুড়ে দেয় ছেঁড়া জুতা। প্রতিদিন অন্যের জুতা মেরামত করে দেড়শ টাকা আয় না হলে তার সংসার ভালোভাবে চলে না। তার কাছে অচলায়তন ভাঙার স্বপ্ন কোনো অর্থ বহন করে বলে মনে হয় না। তবুও সাহসে ভর করে জানতে চেয়েছিলাম, ‘কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়াতে ইচ্ছা করেছে? অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে আপনার ভূমিকা কতটুকু?’
প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তার অসমান দাঁতের সারিতে সামান্য বিদ্রূপের হাসি ঝলসে ওঠে। খুব সহজ কণ্ঠে বললেন, ‘রাজনীতি কি আমারে ভাত দিব? আমি ক্যান ফাল পাড়ুম?’
বেরাইদ অঞ্চলের অনেক ভেতরের এক গ্রামে মামাদের আশ্রয়ে থাকেন সন্তোষ। তারাই একটা ঘর দিয়েছে মাথা গোঁজার জন্য। তার নিজের কোনো ঘরবাড়ি নেই, যাকে সাকিন বলা যায়। বিয়ে করেছেন সেই কবে। স্ত্রী আর এক পুত্র ও কন্যা নিয়ে তার সংসার। কোনোদিন সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেননি, পার্কে বেড়াতে যাননি। এখানে-সেখানে তালি দেওয়া একটা বড় ছাতার তলায় ছড়িয়ে থাকে সন্তোষের জুতা সেলাইয়ের সামগ্রী। মাসে একবার বাসে চেপে বংশালে যান সেলাই করার সরঞ্জাম কিনতে। জুতা পালিশের কালি সংগ্রহ করতে। প্রতি মাসে বারোশ টাকার সরঞ্জাম কিনতে হয়। জুতা সেলাই আর পালিশ করেই প্রতি মাসে বারোশ টাকা আয়ের পথটা ঠিক রাখতে হয় তাকে। ছেলে তেমন কোনো আয় করে না। সত্তর বছর বয়সে সন্তোষকেই সংসার টানতে হয় আজও।
‘জুতা সেলাই কীভাবে শিখলেন?’
উত্তর দিতে গিয়ে আবারও অমলিন হেসে সন্তোষ বললেন, ‘নিজের জ্ঞানের ওপর ভিত্তি কইরা শিখছি; কেউ শিখায় নাই আমারে। এহন এইটাই বাঁইচা থাকার রাস্তা।’
সন্তোষের বাবা একদা বেরাইদে বর্গাচািষ ছিলেন। অন্যদের জমি চাষাবাদ করে তাদের জীবন চলত। কিন্তু চার ভাই আর দুই বোনের সংসারে বাবার মৃত্যুর পর অভাব শূন্যস্থান পূরণ করে স্বাভাবিক নিয়মে। পেশার সন্ধানে নামতে হয় সন্তোষকে। জুতা সেলাইয়ের কাজ শেখা সেই সময়ে।
‘পুরনো কাস্টমাররা আর আসে না কেউ? যাদের সঙ্গে ত্রিশ অথবা তারও বেশি সময় আগে মাঝে মাঝে দেখা হতো তারা কোথায় এখন?’
‘জানি না। কেউ আর আসে না। কত মানুষ চইলা গেছে। এহন নতুন মানুষের মেলা চাইরপাশে। ভালা লাগে না কিছু।’
কথা বলতে বলতে দেখি আকাশে তীব্র রোদ মরে আসছে। একটু পরেই বিকাল টপকে শহরে আলো জ্বলে উঠবে। ছত্রখান হয়ে থাকা কাজের জিনিসপত্র গুছিয়ে বাড়ির পথে রওনা হবেন সন্তোষ। বিকাল পাঁচটার পর আর তাকে দেখা যায় না।
‘বাড়ি গিয়ে কী করেন?’
‘দুটা জাউ ভাত খাই।’
‘সামান্য জাউ ভাতে আপনার হয়ে যায়?’
‘আর কী খামু; আর কিছু খাইতে ভালা লাগে না।’
‘খাওয়ার পর কী করেন, মানে অবসর সময় কাটান কীভাবে?’
‘গান করি নিজে নিজে। দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিক গান গাই, গান গাইতে ভালা লাগে।’
একসময় এই জুতা সেলাইয়ের কাজ আর করতে পারবেন না সন্তোষ। শরীর ক্রমেই ভেঙে পড়ছে, ক্লান্তি ভর করছে। চলে আসার সময় জানতে চেয়েছিলাম, তখন কী করবেন সন্তোষ? উদাসীন দৃষ্টিতে ব্যস্ত পথের দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিলেন, ‘এই শহরে আর আসুম না। গেরামেই থাকুম। আমার তো আর যাওনের জায়গা নাই। অনেকের অনেক কিছু হইল, আমার কোনো গতি হইল না।’




