উত্তপ্ত কলকাতা
নাবালিকাকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ, পিটুনিতে নিহত ১

নাবালিকার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক উত্তেজনা। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক নাবালিকার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রবিবার ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের অভিযোগ, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া ওই মুসলিম নাবালিকাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মরদেহ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হয়েছে বিক্ষোভ, সড়ক ও রেলপথ অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং পিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যু।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, শনিবার বিকেলে খাবার কিনতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১১ থেকে ১২ বছরের ওই নাবালিকা। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে। রাতভর খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। রবিবার সকালে বাড়ি থেকে কিছু দূরের একটি পুকুরে তার মরদেহ ভাসতে দেখা যায়। খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা।
পরিবারের অভিযোগ, চারজন মিলে নাবালিকাকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। পরে প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে মরদেহ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, এ ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির কর্মীও রয়েছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে দলটির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শ্বাসরোধ করে নাবালিকাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
ঘটনার পর মরদেহ ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করেন ক্ষুব্ধ জনতা। সড়ক অবরোধ করেন তারা এবং সূর্যপুর রেলস্টেশন অবরোধ করলে নামখানা থেকে শিয়ালদহ রেলপথে প্রায় এক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ সময় পুলিশের গাড়িতে ভাঙচুর, পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরুতে পুলিশ যথেষ্ট তৎপর না হওয়ায় মানুষের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।
ঘটনার তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, অন্তত একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রবিবার রাতেই নাবালিকার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয় মরদেহের।
এদিকে বিক্ষোভ চলাকালে এক যুবককে পিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, তাকে সন্দেহভাজনদের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। এ ঘটনাটিও আলাদাভাবে তদন্ত করছে পুলিশ।
ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। নাবালিকার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি ভবানী ভবনে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য পরিবারকে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন কী ঘটল যে হঠাৎ আমার বাড়ির সামনে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হলো? আমরা চোর না ডাকাত? কোনো দিন দাঙ্গা করেছি? আমি তো এখন একা, একা যাব বলেছিলাম। আমাকে নিয়ে এত চিন্তা কেন? আমাকে নজরবন্দি করা হয়েছে কেন? আপনারা কী চাইছেন আমি বুঝতে পারছি না?’ তার অভিযোগ, তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে।
এদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি সরকারের সমালোচনা করে নারী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে বলা হয়েছে, ‘বাংলায় মহিলাদের ওপর অপরাধের গ্রাফ ক্রমশ বাড়ছে, অথচ বিজেপির সমস্ত ভুয়া প্রতিশ্রুতি আবারও মুখ থুবড়ে পড়েছে। ক্ষমতা দখলের জন্য ফাঁপা প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় বিজেপি সবসময় এগিয়ে। কিন্তু যখন মহিলাদের পাশে দাঁড়িয়ে সুবিচারের কথা আসে, তখন তারা নীরব।’
এ ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে অভিযুক্তদের সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির সংশ্লিষ্টতা এবং স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।




