‘ঢাকায় ফেলে এসেছি আমার সবটা’

মোহাম্মদ মনির হোসেন
ঢাকা ছেড়ে এসেছি প্রায় পনেরো বছর হয়ে গেল। এই সময়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বিদেশের মাটিতে নিজের মতো একটা দুনিয়া গড়ে নিয়েছি। এখন এই ঘর-সংসারটাকেই নিজেদের দুনিয়া মনে হয়। এখান থেকে অন্য কোথাও গেলে হাঁসফাঁস লাগে, মনে হতে থাকে কত দ্রুত এই দুনিয়ায় ফিরে আসা যাবে! তবু মাঝেমধ্যে রাতের নিস্তব্ধতায়, কিংবা কোনো বিষণ্ন বিকালে, মনটা হঠাৎ উড়াল দেয় সেই চেনা শহরের দিকে।
তবে পৃথিবীর সবচেয়ে অপূর্ব ও আধুনিক শহরগুলো দেখে ফেলার পরেও, যে শহরটাকে ভুলতে পারি না, তা আমার প্রাণের শহর ঢাকা। শহরটা বিশৃঙ্খল, কোলাহলপূর্ণ, যানজটে নাকাল— এ কথা সবাই জানে। কিন্তু এ বিশৃঙ্খলার ভেতরেও ঢাকার একটা আলাদা প্রাণ আছে, নিজস্ব ছন্দ আছে, যা একবার গায়ে লাগলে আর ছাড়তে চায় না।
ঢাকার কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি মিস করি, জিজ্ঞেস করলে একটু দ্বিধায় পড়তে হয়। কারণ, ফেলে আসা মানুষগুলোকে মিস করি, ঢাকার সংস্কৃতিকে মিস করি, নানারকম খাবার— ফুচকা থেকে পুরান ঢাকার বিরিয়ানি— সবকিছু মিস করি। চেনা-পরিচিত অলিগলি মিস করি। ঈদের আগের রাতের উত্তেজনা, পহেলা বৈশাখের ভোরে রমনার বটমূলে মানুষের ঢল— এসবও মিস করি।
ঢাকায় ফেলে এসেছি আমার শৈশব, আমার কৈশোর, আসলে আমার সবটা— যা বুকের গভীরে গেঁথে আছে চিরকালের জন্য
তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোনটা মিস করি? প্রশ্নটা আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও আসলে কঠিন। যা মিস করি তার অনেক কিছুই পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব। কিন্তু কিছু বিষয় আছে, যা কোনোভাবেই ফিরে পাওয়ার নয়।
যে অলিগলিতে ঘুরে বেড়িয়ে বড় হয়েছি, দল বেঁধে খেলাধুলা করে বেড়ে উঠেছি— সেই অলিগলি, বন্ধুদের সঙ্গে জমানো আড্ডাগুলোই সবচেয়ে বেশি মিস করি। মনে পড়ে পাড়ার মাঠে বিকালগুলোর কথা, বৃষ্টির দিনে কাদায় ভিজে বাড়ি ফেরার আনন্দ। মনে পড়ে সন্ধ্যার আজানের পর বাতাসে ভেসে আসা খাবারের গন্ধ, মায়ের গলার ডাক আর দরজার চৌকাঠে বসে গল্প করার অলস দুপুরগুলোর কথা।
অন্য অনেক কিছু হয়তো অন্য কোথাও পাওয়া যায়, কিন্তু ঢাকায় কাটানো শৈশব, বেড়ে ওঠার সময়— এ সম্পদ কোটি টাকা খরচ করেও আর ফিরে পাওয়ার নয়। ঢাকায় ফেলে এসেছি আমার শৈশব, কৈশোর, আসলে আমার সবটা— যা বুকের গভীরে চিরকালের জন্য গেঁথে আছে।
লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এই বাংলাদেশি ঘুরে বেড়িয়েছেন চার মহাদেশের আটটি দেশ।




