ট্রেনের জানালায় কার আক্রোশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
লোহার ট্র্যাক ধরে ছুটে চলেছে গতি। জানালা দিয়ে আসছে মুক্ত বাতাস। মানুষ ঘরে ফিরছে। কেউ বা যাচ্ছে অজানাকে ছুঁতে। এমন এক অলস মুহূর্তে হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে ধেয়ে এলো একখণ্ড পাথর। কাচ ভাঙার শব্দ। রক্ত। আর্তনাদ। ব্যস, মুহূর্তেই একটি জীবন চিরতরে অন্ধকারে তলিয়ে গেল। সম্প্রতি বাংলাদেশের রেলপথে এই দৃশ্যটি বড় চেনা হয়ে উঠেছে।
রেলওয়ের সাম্প্রতিক তথ্য এক ভয়ানক বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলছে। বিগত ১৭ মাসে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ট্রেনগুলোতে অন্তত ২২৪টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। অদ্ভুত বিষয় হলো, এই আক্রমণের মূল নিশানা কোনো ভাঙাচোরা লোকাল ট্রেন নয়। পাথর বেশি জুটছে দেশের সবচেয়ে আধুনিক, বিলাসবহুল ও বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর কপালে। হামলার শিকার শীর্ষ পাঁচটি ট্রেনের চারটিই বিরতিহীন—পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস।
কেন এই আক্রোশ? গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক ও কাঠামোগত ক্ষোভ। করোনা মহামারীর পর থেকে দেশে শতাধিক দ্বিতীয় শ্রেণির লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন যেসব আধুনিক ট্রেন চালু হয়েছে, সেগুলো বড় স্টেশন ছাড়া কোথাও থামে না। সাধারণ যাত্রীরা নিজ এলাকায় ট্রেনের যাত্রাবিরতির দাবিতে দিনের পর দিন আন্দোলন করেও ফল পাচ্ছেন না। রেলের এই উদাসীনতা থেকেই জন্ম নিচ্ছে ক্ষোভ। ট্রেন না থামা স্টেশন এলাকার ক্ষুব্ধ মানুষগুলো তাই ছুটে চলা ট্রেনে পাথর ছুড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিডিউল বিপর্যয়ের ক্ষোভ, যেমনটা দেখা গেছে বিজয় এক্সপ্রেসের ক্ষেত্রে।
রেলওয়ের ব্যর্থতা আর মানুষের অবদমিত আক্রোশের মাশুল দিচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে চলন্ত ট্রেনে পাথর লেগে চোখ হারিয়েছেন এক আয়কর আইনজীবী। কক্সবাজারের চকরিয়ায় পাথরের আঘাতে দাঁত ভেঙেছে তরুণের, রক্তাক্ত হয়েছেন রেলকর্মী। এই পাথরের আঘাতেই প্রাণ হারিয়েছিলেন নারী প্রকৌশলী প্রীতি দাশ।
এই ঘটনাগুলো অপরাধ তো বটেই, তবে আমাদের এই মহান সমাজে অপরাধ আর বিচ্যুতিকে যেভাবে ‘নস্টালজিয়ার’ মোড়কে আদর দেওয়া হয়, তা এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। যেমন ধরুন, আমাদের ঢাকার নামি দুই বিদ্যাপীঠ— ঢাকা কলেজ আর সিটি কলেজের বীরপুঙ্গবদের কীর্তিকলাপ। মাঝেমধ্যেই এ দুই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারিরা রাজপথে লাঠিসোটা নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড বাধায়। সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকে না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অচল হয়ে পড়ে রাজধানী। কিন্তু সমাজ কী করে? এই কলেজগুলোর প্রাক্তন শিক্ষার্থী, তাদের অনেকেই হয়তো জাঁদরেল ব্যক্তিত্ব বা সুশীল প্রবীণ, তারা যখন তরুণদের সামনে বসেন, তখন চায়ের কাপে তুফান তুলে গর্বভরে নিজেদের আমলের মারামারির গল্প শোনান। কে কাকে কীভাবে রড নিয়ে তাড়া করেছিলেন, কার মাথা ফাটিয়ে কোন গলিতে লুকিয়েছিলেন— সেসব ‘ঐতিহাসিক বীরত্বগাথা’ আড্ডায় রোমন্থন করা হয় পরম তৃপ্তিতে।
বড়দের এই প্রচ্ছন্ন বাহবা আর ‘আমাদের সময়েও এমন হতো’ মার্কা রসালো স্মৃতিচারণ ছোটদের মনে এক বার্তা দেয়। যে ছেলেটি কলেজের প্রাক্তন বড় ভাইদের মুখে সেই মারধরের গল্প শুনে বড় হচ্ছে, সে তো এটাকে এক্কেবারে স্বাভাবিক আর নির্দোষ একটা ব্যাপার মনে করছে! অবলীলায় রাজপথে নেমে সহপাঠীকে কোপাতে তার হাত তাই একটুও কাঁপে না।
ঠিক এই একই ছাঁচে তৈরি হচ্ছে রেললাইনের ধারের গ্রামের ওই কিশোরটিও। সে-ও হয়তো তার মুরব্বি বা বড় ভাইদের আড্ডায় শুনেছে— কীভাবে এককালে চোখের নিমেষে চলন্ত ট্রেনের কাচ উড়িয়ে দেওয়া হতো। ওই বয়সে মুরব্বিদের মুখে এমন দুর্ধর্ষ গল্প শুনে সে-ও অবচেতনে এই অপরাধকে একধরনের রোমাঞ্চকর ‘স্বাভাবিকতা’ বলে ধরে নিচ্ছে। নির্দোষ চিত্তে, স্রেফ আনন্দের খোঁজে সে যখন ট্রেনের জানালায় পাথর ছুড়ছে, সে তো আমাদেরই তৈরি করা এক সুবোধ সন্তান! বড়রা তাকে ট্রেনের গতি ছুঁতে শিখিয়েছে, কিন্তু অন্যের জীবনের মূল্য শেখায়নি।
অপরাধকে হালকা করে দেখার এবং হিংস্রতাকে ‘ছেলেমানুষি’ বলে স্বাভাবিকীকরণের এই চমৎকার সংস্কৃতিই আজ রেলপথের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রেনের গতি যদি আমাদের সময়ের প্রতীক হয়, তবে সেই গতিকে লক্ষ্য করে ছোড়া পাথরটি আমাদের ভেতরকার আদিম অন্ধকারের প্রতীক। যতক্ষণ আমরা এই অন্ধকারের পিঠ চাপড়ে ‘বাছা আমার বীরের সন্তান’ বলে আদর দেব, ততক্ষণ প্রীতি দাশদের লাশ হতে হবে আর শ্যামল চন্দ্র দাসদের হারাতে হবে চোখের জ্যোতি।
তবে কি এই অন্ধকারের কোনো শেষ নেই? এই মরণখেলা থামানোর দায় কার? সমাধান কেবল রেলের পাহারা বাড়ানো বা পুলিশের লাঠিতে লুকিয়ে নেই। এর জন্য চাই একপক্ষীয় নয়, বহুমাত্রিক সামাজিক প্রতিরোধ।
এগিয়ে আসতে হবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনকে। শুধু ট্রেনের গতি বাড়ালে চলবে না, প্রান্তিক মানুষের যাতায়াতের অধিকারের প্রতিও সংবেদনশীল হতে হবে। বন্ধ হওয়া লোকাল ট্রেনগুলো চালু করা এবং যৌক্তিক স্টেশনে যাত্রাবিরতির ব্যবস্থা করলে ক্ষোভের আগুন অনেকটাই থিতিয়ে আসবে। শুধু ঘটনার পর তদন্ত নয়, রেললাইনের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে, আইন অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
কিন্তু আইনের চেয়েও বড় হাতিয়ার মনস্তাত্ত্বিক বদল। আর সেই বদলের শুরুটা হতে হবে পরিবার থেকে। মুরব্বিদের অপরাধের গল্প শোনানো বন্ধ করতে হবে। স্কুল-কলেজ এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব হবে কিশোরদের সচেতন করা। স্কুলগুলোতে নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং ‘পাথর ছোড়া বীরত্ব নয়, অপরাধ’— এই বোধটা সিলেবাসের বাইরে গিয়েও মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হবে। স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো লাইনের ধারের মানুষদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করতে পারে।
আর এই গোটা লড়াইয়ে বারুদ জোগাতে পারে গণমাধ্যম। টেলিভিশনের পর্দা থেকে সংবাদপত্রের পাতা— সবখানে এই অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে। মারামারির নস্টালজিয়া কিংবা পাথর ছোড়ার ঘটনাকে ‘কিশোরদের দুষ্টুমি’ বলে প্রচার না করে এর পেছনের নিষ্ঠুরতা আর অপরাধমূলক রূপটিকে নগ্নভাবে হাজির করতে হবে। যেদিন আমরা অপরাধকে অপরাধ বলতে শিখব, গল্পে-আড্ডায় হিংস্রতার স্তুতি বন্ধ করব, সেদিনই হয়তো চলন্ত ট্রেনের জানালাগুলো আবার নিরাপদ হবে। গতি আর রক্তের সহবাস বন্ধ হোক, আমাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক




