ভেজাল পণ্যে ইসলামের সতর্কতা

মুফতি সাইফুল ইসলাম
বর্তমানে এমন একটা সময় যাচ্ছে, যখন বাজারে যাওয়া মানেই একধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া। যে খাবারটি পরিবারের জন্য কিনছি, তা কতটা নিরাপদ? যে দুধ শিশুকে খাওয়ানো হচ্ছে তা কি সত্যিই বিশুদ্ধ? যে তেল-মসলা বা টুথপেস্ট ব্যবহার করছি, তাতে এমন কোনো ক্ষতিকর উপাদান আছে কি না; যা ধীরে ধীরে আমাদের শরীরকে বিষিয়ে তুলছে? এমন প্রশ্ন প্রতিনিয়ত নিজেকে তাড়া করে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমে টুথপেস্ট, সয়াবিন তেল, গুঁড়া দুধসহ নানা পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির খবর উঠে আসছে। খাদ্যে ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ উপাদান ব্যবহার, ভুয়া লেবেলিং, ওজনে কম দেওয়া আর বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের ঘটনাও বারবার সামনে আসছে। যাতে মারাত্মকভাবে ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়ছে।
অথচ ইসলাম ব্যবসাকে সম্মানজনক পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে সেই ব্যবসা হতে হবে সততা, আমানতদারি ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। মানুষের অজ্ঞতা বা বিশ্বাসকে পুঁজি করে অনৈতিক লাভ করা ইসলাম সমর্থন করে না; বরং তা জুলুম ও প্রতারণা মনে করে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যখন তারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেয়, তখন পূর্ণমাত্রায় নেয়; আর যখন তাদের জন্য মেপে দেয় বা ওজন করে, তখন কম দেয়।’ (সুরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত: ১-৩)
এ আয়াতের প্রেক্ষাপট ওজন ও পরিমাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এর শিক্ষা অনেক বিস্তৃত। যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক প্রতারণা, পণ্যের প্রকৃত মান গোপন করা, ভেজাল মেশানো বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা মানুষের জিনিস কম দিও না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িও না।’ (সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ৮৫)
এতে বোঝা গেল যে, ব্যবসায় সততা শুধু একটি নৈতিক গুণই নয়; এটি আল্লাহর নির্দেশও।
রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন খাদ্যশস্যের স্তূপে হাত ঢুকিয়ে ভেতরে ভেজা অংশ দেখতে পান, যা বিক্রেতা লুকিয়ে রেখেছিল। তখন তিনি বললেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ১০২)
এই হাদিস ইসলামি ব্যবসায়িক নীতির ভিত্তি। একজন মুসলিমের পরিচয় কখনো প্রতারণার সঙ্গে একত্র হতে পারে না। ভেজাল পণ্য উৎপাদন, নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার, মিথ্যা লেবেল লাগানো কিংবা ক্ষতিকর তথ্য গোপন করা এই হাদিসের সরাসরি পরিপন্থী।
ইসলাম সৎ ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সৎ, বিশ্বস্ত ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯)
অর্থাৎ ব্যবসায় যদি সততা ও আল্লাহভীতি থাকে, তাহলে তা লাভের মাধ্যমের পাশাপাশি ইবাদতেও পরিণত হয়।
আধুনিক গবেষণাও দেখাচ্ছে, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিরাপদ খাদ্যকে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক দূষণকে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সাম্প্রতিক নানা গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস এবং মস্তিষ্কের টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। যদিও এসবের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান, তবুও বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। (সূত্র: নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন ২০২৪, হো ফুডসেফটি ফেক্ট শিট)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসলামের একটি মৌলিক নীতি বলে দিয়েছেন, ‘ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্য করাও যাবে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০) ইমাম নববী এটিকে ইসলামি আইনের একটি মৌলিক নীতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
যখন কোনো প্রতিষ্ঠান জেনেশুনে ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করে বা নিরাপত্তাহীন পণ্য বাজারজাত করে, তখন তারা শুধু আইন ভঙ্গ করে না; ইসলামের এই মৌলিক নীতিও লঙ্ঘন করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে ভোক্তার অধিকার একটি স্বীকৃত অধিকার। ক্রেতা পণ্যের প্রকৃত মান জানার অধিকার রাখে। বিক্রেতার দায়িত্ব হলো ত্রুটি গোপন না করা। ইসলামি ফিকহে ‘খিয়ারুল আইব’ নামে একটি নীতি রয়েছে, যার অর্থ হলো পণ্যের গোপন ত্রুটি থাকলে ক্রেতা তা ফেরত দেওয়ার অধিকার রাখে। ইমাম ইবনু কুদামা তার আল-মুগনি গ্রন্থে এবং ইমাম কাসানি বাদায়িউস সানায়ি গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এটি প্রমাণ করে, ইসলাম বহু শতাব্দী আগে থেকেই ভোক্তার অধিকারকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশেও নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ খাদ্যে ভেজাল, মিথ্যা তথ্য প্রদান, ওজনে কম দেওয়া এবং প্রতারণামূলক ব্যবসাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আইন প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু আইন দিয়ে এ সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। পণ্যে ভেজাল রোধের জন্য প্রয়োজন নৈতিক জাগরণ এবং আল্লাহভীতির সংস্কৃতি। তাই ভেজালের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; ব্যবসায়ী, উৎপাদক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, গণমাধ্যম এবং ভোক্তা— সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি লেনদেনের সাক্ষী আল্লাহ। বাজারের নজরদারি এড়ানো গেলেও তার বিচার থেকে কেউ রক্ষা পাবে না।
তাই ব্যবসায়ীগণ যদি মনে রাখেন, প্রতিটি বিক্রি হওয়া পণ্যের হিসাব একদিন মহান রবের কাছেও দিতে হবে, তাহলে বাজারে ভেজালের অন্ধকার অনেকটাই দূর হতে পারে।
আর ইসলামের মৌলিক নীতি ‘ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্য করাও যাবে না’র আলোকে একজন সচেতন ভোক্তাও যদি নিজের অধিকার সম্পর্কে সজাগ থাকেন, তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতারণার সুযোগ ক্রমে সংকুচিত হবে। ইসলাম এমনই একটি সমাজ চায়, যেখানে লাভের চেয়ে নৈতিকতা আর মুনাফার চেয়ে মানুষের কল্যাণ বেশি মূল্যবান।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






