খুঁটিতে বাঁধা বাবার মুখে খাবার, মেয়ের মমতায় পরিবারে নতুন স্বপ্নের উঁকি

বাঁ থেকে খুঁটিতে বাঁধা বাবাকে চা দিয়ে রুটি খাইয়ে দিচ্ছে ৯ বছরের তুবা। ছবি: আগামীর সময়
খুঁটিতে বাঁধা বাবার দুই হাত-পা, ঘিরে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ। কারও চোখে কৌতূহল, কেউ ভিডিও করছেন মোবাইল ফোনে। এই ভিড় ঠেলে বাবার কাছে এগিয়ে যায় ছোট্ট মেয়েটি। হাতে রুটি ও চা। সামনে বসে রুটিতে চা ভিজিয়ে মুখে তুলে দেয় বাবার।
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার ৯ বছর বয়সী তুবা আক্তার তারিন ও তার বাবা অনিক সরদারের এই দৃশ্যের একটি ভিডিও গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেইসঙ্গে চুরির অভিযোগে আটক ও মারধরের ঘটনার পাশাপাশি সামনে আসে পরিবারটির দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, অনিকের নেশায় জড়িয়ে পড়ার অতীত, স্থানীয় বিরোধের অভিযোগ এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষার কথা।
কয়েক দিন আগেও যাকে ঘিরে ছিল নানা অভিযোগ, এখন তার বাড়িতে যাচ্ছেন মানুষ। কেউ খাবার নিয়ে, কেউ আর্থিক সহায়তা নিয়ে, কেউবা শুধু খোঁজ নিতে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর ভোররাতে বামরাইল এলাকার একটি বাড়িতে চুরির চেষ্টা করার অভিযোগে অনিককে আটক করা হয় বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। পরে তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়। ওই সময়ের একটি ভিডিওই ছড়িয়ে পড়ে।
তবে ঘটনাটি ঘিরে ভিন্ন বক্তব্যও রয়েছে। অনিকের পরিবারের দাবি, জমি নিয়ে পুরনো বিরোধের জেরেই চুরির অপবাদ তুলে অনিককে ধরে মারধর করা হয়েছে।
অনিকের স্ত্রী জান্নাতুল ফিরদাউস বলেন, স্থানীয় আয়াত খন্দকার, খাইরুল ইসলাম, আরিফ, হানিফ, সাকিব ও সাহিদসহ কয়েকজনের সঙ্গে তাদের জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে।
তবে আয়াত খন্দকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, অনিকের বিরুদ্ধে এর আগেও চুরির অভিযোগ উঠেছিল। তার দাবি, অনিককে মেয়ের সামনে মারধর করা হয়নি।
স্থানীয় কয়েকজনও অনিকের বিরুদ্ধে আগে চুরির অভিযোগ ওঠার কথা বলেছেন। কেউ কেউ তাকে নেশাগ্রস্ত বলেও দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অনিকের স্ত্রী জান্নাতুল ফিরদাউস বলেন, তাদের দুই সন্তান তুবা (৯) ও তুরিন ইসলাম তুনা (৩)। সংসারে নিয়মিত কোনো আয় নেই। অভাবের মধ্যেই সন্তানদের বড় করছেন তারা।
পরিবারের ভাষ্য, অনিকের বাবা একসময় স্বচ্ছল ছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর তার চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারের অনেক সম্পদ চলে যায়। তাদের কিছু পারিবারিক সম্পদ ও আয়-রোজগারের সুযোগ থাকলেও, বর্তমানে সংসারে স্থায়ী আয়ের সংকট রয়েছে। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একটি কাজের ব্যবস্থা চান তারা।
অনিক বর্তমানে নিজের ভুল থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান বলে জানিয়েছেন।
‘আমি ভালোভাবে জীবনযাপন করতে চাই। কেউ যদি আয়-রোজগারের একটা পথ তৈরি করে দেন, আমি নিজেকে বদলে ফেলব,’ বলছিলেন তিনি।
ভাইরাল ভিডিওটি শুধু মানুষের আবেগই নাড়া দেয়নি, পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও তৈরি করেছে। ভিডিওটি দেখে বিষয়টি যাচাই করতে ওয়েব ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বরিশালে তাদের টিমকে জানানো হয়। পরে স্বেচ্ছাসেবকরা পরিবারটির সঙ্গে দেখা করেন। তুবা তাদের কাছে বাবার জন্য একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করে।
ওয়েব ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় অনিক একটি অটোভ্যান চেয়েছেন। তাকে একটি অটোভ্যান কিনে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তুবার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ারও উদ্যোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে উজিরপুর থানা পুলিশের সঙ্গেও কথা বলেছে ওয়েব ফাউন্ডেশন। থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ফারুক বিষয়টি দেখার এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন বলে ওয়েব ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পুলিশ ও প্রশাসনও পরিবারটির খোঁজখবর নিয়েছে। উজিরপুর থানার ওসি মো. রাকিবুল ইসলাম সেদিনই পুলিশ পাঠিয়েছিলেন ঘটনাস্থলে। অনিককে ছাড়ানোর ব্যবস্থাও করেন।
গতকাল রবিবার সকালে অনিকের পরিবারের খোঁজ নিতে যান উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা।
তিনি বলেন, অনিক যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তাহলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে প্রশাসন।
তুবার সেই ভিডিওতে কোনো দীর্ঘ বক্তব্য ছিল না। ছিল না কোনো নাটকীয় সংলাপও। ছিল শুধু দড়িতে বাঁধা বাবার অসহায় মুখ আর তার সামনে বসে খাবার তুলে দেওয়া একটি শিশুর হাত। সেই দৃশ্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে ভিডিওটির আবেগের বাইরে ঘটনাটির আরও কয়েকটি দিকের উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি— অনিকের বিরুদ্ধে ওঠা চুরির অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি কী, তাকে মারধরের ঘটনায় কারা জড়িত এবং পরিবারের পক্ষ থেকে বলা জমি বিরোধের সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না।
চুরির অভিযোগ সত্য হলেও তা কাউকে আটকে রেখে মারধর করার বৈধতা দেয় না। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে অভিযোগের সত্যতাও নিশ্চিত করা যায় না।
ফলে ঘটনাটির প্রকৃত সত্য জানতে চুরির অভিযোগ, মারধরের ঘটনা এবং জমিবিরোধ— প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে।
এর মধ্যেই তুবার ছোট্ট হাতের কয়েক লোকমা খাবার অনিকের পরিবারের জীবনে অন্য রকম এক পরিবর্তন এনেছে। যে বাড়িতে কয়েক দিন আগেও ছিল অভাব, অভিযোগ আর অনিশ্চয়তা, সেখানে এখন সহানুভূতি আর প্রতিশ্রুতির বসত।
পরিবারের আশা, এই সহানুভূতি যদি স্থায়ী কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করে, তাহলে অনিকও হয়তো ফিরে যেতে পারবেন স্বাভাবিক জীবনে।



