খাগড়াছড়ির টানে বহুমাত্রিক

রিছাং ঝরনার সামনে বহুমাত্রিকের সদস্যরা
চলো দোতং পাহাড় জুম ঘরে, পূর্ণিমা রাত বর্ষা জুড়ে. জীবন জুয়ার আসর বসাবো! জীবন জুয়ার এই আসর বসাতে চারপাশের কোলাহল, যানজট আর প্রতিদিনের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে পাহাড়ি পথ ধরে ছুটে চলা। সেই টানেই এবার গন্তব্য ছিল খাগড়াছড়ি। সঙ্গী ছিল মিরপুর বহুমাত্রিকের একদল বন্ধু।
ভ্রমণের পরিকল্পনাটা অনেক দিনের। বন্ধুদের সঙ্গে কয়েকবার আলোচনা হলেও সময় ও নানা ব্যস্ততার কারণে শেষ পর্যন্ত যাওয়া হচ্ছিল না। অবশেষে এক দিন ঠিক হলো, আর কোনো অজুহাত নয়,এবার সত্যিই পাহাড়ের পথে যাত্রা।
শহরের কংক্রিটের ভবনের জায়গা নিল সবুজ মাঠ, গাছপালা আর ধীরে ধীরে চোখের সামনে স্পষ্ট হতে থাকা পাহাড়ের সারি। খাগড়াছড়িতে পৌঁছানোর পর প্রথমেই যে বিষয়টি মন কেড়ে নেয়, তা হলো এখানকার নির্মল পরিবেশ। পাহাড় ঘেরা রাস্তা, সবুজের সমারোহ আর তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ। সব মিলিয়ে মনে হয় শহরের চেনা জীবন থেকে যেন অনেক দূরে চলে এসেছি।
ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আলুটিলা। পাহাড়ের বুকের ভেতর থাকা আলুটিলা গুহা দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাই ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। বাইরে ঝলমলে আলো আর সবুজ প্রকৃতি, আর গুহার ভেতরে ঢুকতেই চারপাশে অন্ধকার। আলো হাতে নিয়ে সরু পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, ছোট্ট কোনো অভিযানের অংশ হয়ে গেছি।
গুহা থেকে বের হওয়ার পর পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগও ছিল। উঁচু জায়গা থেকে দূরের পাহাড়, আঁকাবাঁকা রাস্তা আর সবুজ প্রকৃতি দেখতে বেশ ভালো লাগছিল। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলে শহরের ব্যস্ততার কথা যেন মনেই থাকে না।
এরপর যাত্রা রিছাং ঝর্ণার দিকে। পাহাড়ি পথের সৌন্দর্যই যেন আলাদা একটি অভিজ্ঞতা। দুই পাশে সবুজ পাহাড়, মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু পথ আর মাঝেমধ্যে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া আকাশ। পুরো যাত্রাটাই হয়ে উঠেছিল উপভোগ্য।
রিছাং ঝর্ণায় পৌঁছানোর পর ঝর্ণার পানির শব্দ, পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ পানি আর চারপাশের সবুজ মিলিয়ে জায়গাটিতে তৈরি হয়েছিল প্রশান্ত এক পরিবেশ। কেউ পানিতে পা ভেজাচ্ছিল, কেউ ছবি তুলছিল, আবার কেউ প্রকৃতির দৃশ্য উপভোগ করছিল নীরবে।
আমার কাছে সব থেকে বেশি উপভোগ্য লেগেছিল তারেং চুমুই। এটি ত্রিপুরা শব্দ। এর মধ্যে 'তারেং' অর্থ উঁচু পাহাড় এবং 'চুমুই' অর্থ মেঘ। উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, পুরো খাগড়াছড়ি যেন চোখের সামনে বিছিয়ে আছে। দূরে একের পর এক পাহাড়ের সারি, মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু রাস্তা, সবুজের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা ঘরবাড়ি। সবকিছু মিলিয়ে যেন প্রকৃতির আঁকা বিশাল এক ছবি।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলছিল না। সবাই নিজের মতো করে সেই দৃশ্য দেখছিল। কেউ ছবি তুলছিল, কেউ ভিডিও করছিল, আবার কেউ শুধু দাঁড়িয়ে থেকে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। এত ওপরে উঠে চারপাশ দেখার অনুভূতিটা ছিল ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
পাহাড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি খাগড়াছড়ির মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিও আমাদের ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। আমাদের ভ্রমণের সময় পূর্ণিমা উপলক্ষে মারমা সম্প্রদায়ের একটি উৎসব দেখার সুযোগ হয়। পাহাড়ি মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি, পোশাক, আয়োজন এবং উৎসবের আবহ কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা ছিল অন্যরকম।
পূর্ণিমার আলো আর উৎসবের পরিবেশ একসঙ্গে মিশে গিয়ে জায়গাটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। আমাদের কাছে এটি ছিল শুধু একটি পর্যটন অভিজ্ঞতা নয়; বরং পাহাড়ের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার একটি সুযোগ।
তবে ভ্রমণের আনন্দ শুধু দর্শনীয় স্থানগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বন্ধুদের সঙ্গে পথ চলার সময়ের হাসি-ঠাট্টা, একসঙ্গে ছবি তোলা, কে কার ভালো ছবি তুলবে, এসব ছোট ছোট ঘটনাই পুরো ভ্রমণকে আরও আনন্দময় করে তুলেছিল।
বিকালের দিকে পাহাড়ের ওপর সূর্যের আলো যখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল, তখন প্রকৃতির সৌন্দর্য যেন আরও বেড়ে গেল। পাহাড়ের গায়ে পড়া শেষ বিকালের আলো আর চারপাশের নীরবতা মিলে তৈরি হয়েছিল মন ভালো করে দেওয়ার মতো এক দৃশ্য।
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, খাগড়াছড়িতে আসার আসল উদ্দেশ্য হয়তো শুধু কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা নয়; বরং প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা বিরতি নেওয়া, কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো এবং প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া।
খাগড়াছড়ির সৌন্দর্য শুধু পাহাড়, ঝর্ণা কিংবা পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার পাহাড়ি জীবন, স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য পুরো অঞ্চলটিকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। তাই একবার ঘুরে দেখার পরও মনে হয়, এই জায়গার আরও অনেক কিছু দেখা বাকি।
ফেরার সময় স্বাভাবিকভাবেই মনটা কিছুটা ভার হয়ে এসেছিল। গাড়ি যখন পাহাড়ি পথ পেরিয়ে আবার শহরের দিকে ফিরছিল, তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, পাহাড়গুলো যেন ধীরে ধীরে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
তবে চাঁদনী রাতে চাঁদের আলোতে পাহাড়ি রাস্তায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার শব্দ এখনো তৈরি হয়নি। আর তখনই সামনে খুলে গেল ভ্রমণের আরেকটি সুন্দর দৃশ্য।
আকাশে উঠেছে পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের নরম আলো পাহাড়ের গায়ে, গাছের পাতায় আর আঁকাবাঁকা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে। দিনের বেলায় যে পাহাড়ি পথকে সবুজ আর উজ্জ্বল দেখেছিলাম, রাতের চাঁদের আলোয় সেই একই পথ হয়ে উঠেছে রহস্যময় ও শান্ত। ফেরার সময়টুকু জীবনের সব থেকে সেরা ভ্রমণের রাত মনে হচ্ছিল।






