পীরগাছায় সারের ডিলারশিপ ভাগ করে নিয়েছেন বিএনপি নেতারা!

সার বিতরণে নতুন করে ডিলার নিয়োগ দিচ্ছে সরকার। তৈরি হচ্ছে তালিকা, চলছে যাচাই-বাছাই। তবে এর মধ্যে রংপুরের পীরগাছায় ঘটেছে লঙ্কাকাণ্ড। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ডিলার ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন বিএনপি নেতারা! কোনো নেতা নিজে ডিলার হয়েছেন, কেউ আবার স্ত্রীকে দিয়েছেন। আবার যেখানে দলটির কেউ চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে পারেননি সেখানে ১৫-২৭ লাখ টাকায় বিক্রি করার অভিযোগ করেছেন খোদ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে মিলেছে এসব তথ্য।
ডিলার নিয়োগের তালিকা এখনো প্রকাশ করেনি প্রশাসন। তবে সেটি চূড়ান্ত হয়েছে বলে প্রশাসন ও বিএনপি নেতাদের কথায় উঠে এসেছে। সম্ভাব্য তালিকায় উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ারা হলেন— কল্যাণী ইউনিয়নে জিকরুল আমিন, পারুলে আবদুল মতিন, ইটাকুমারীতে মাহমুদুল হাসান, অন্নদানগরে জয়িতা আক্তার জেমি, ছাওলায় জাকির হোসেন, তাম্বুলপুরে সুইটি আক্তার, পীরগাছা সদরে সুলতানা ফেরদৌসী, কৈকুড়িতে তৌফিক ও কান্দিতে আতাউর রহমান। তাদের অধিকাংশই আবার জীবনেও সার বা কীটনাশকের ব্যবসা করেননি। তালিকায় স্থান পাওয়াদের মধ্যে সুলতানা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী। সুইটি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের স্ত্রী। আতাউর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তবে তিনি ফ্রিতে এই ডিলারশিপ পাননি, ঘুস দিতে হয়েছে ২৭ লাখ টাকা। এসব তথ্যের কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে একটি কথোপকথনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আলাপটি হয়েছে অন্নদানগর ইউনিয়নের কীটনাশক ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও সার-কীটনাশক ব্যবসায়ী আবদুর রহিমের মধ্যে। অডিও ক্লিপে শোনা যায়, তারা উভয়ই ডিলারশিপের জন্য আবেদন করলেও জায়গা পাননি তালিকায়। একে অপরকে আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা দিয়ে ডিলারি নিতে পারব না।’ তাদের কথোপকথনেই উঠে আসে আতাউরের ২৭ লাখ টাকা ঘুস দেওয়ার তথ্য এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ডিলার নিয়োগ-বাণিজ্যের কথা।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার সাত ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭, অন্নদানগরে ১৫, পারুলে ১৮, কান্দিতে সর্বোচ্চ ২৭, ছাওলায় ২৩ ও কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। সাত ইউনিয়নের কথিত অর্থের হিসাব যোগ করলে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এই বাণিজ্যের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা। তার সহযোগী সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজ।
নেতাকর্মীদের দাবি, এই ঘুস-বাণিজ্যের প্রতিবাদ করায় কান্দি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক জিয়াউর রহমানকে দেওয়া হয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিস। পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অন্নদানগর ইউনিয়নের ডিলার পদপ্রার্থী আবদুস ছাত্তার সরকার ও তৈয়ব হোসেন। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজ তার স্ত্রীর নাম থাকার কথা স্বীকার করে বললেন, ‘আমরা রাজনীতি করি, আমাদের স্ত্রীরাই সংসারসহ ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করেন।’
কোটি টাকা ঘুস-বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইমলাম রাঙ্গার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি তিনি।
উপজেলা কৃষি অফিসার নিলুফা ইয়াসমীনের ভাষ্য, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। কমিটির সভাপতি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলতে পারবেন।’ পীরগাছার ইউএনও জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিন বললেন, ‘স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে তিনজনের তালিকা তৈরি করে আমরা পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তিনিই তার জবাব দেবেন।’



