‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রি নিয়ে ইউপিএল বিক্রয়কেন্দ্রে বাধার অভিযোগ

সংগৃহীত ছবি
শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রি নিয়ে প্রকাশনা সংস্থা দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর জেরে বিক্রয়কেন্দ্রের দুই কর্মীকে তুলে নিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয় বলেও পাওয়া গেছে অভিযোগ।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ইউপিএল-এর বিক্রয়কেন্দ্রে দুই যুবক ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কিনতে চাইলে তাদের বইটি দেখানো হয়। এ সময় তারা বইটিকে ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করে এটি কেন বিক্রি করা হচ্ছে, তা জানতে চান। একপর্যায়ে তারা সেখানে হট্টগোল শুরু করেন এবং আশপাশের লোকজন জড়ো করেন। পরে বিক্রয়কেন্দ্রের দুই কর্মীকে ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
সূত্রাপুর থানার ওসি মতিউর রহমান আগামীর সময়কে বলেন, ‘কিছু লোক ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রি করার অভিযোগ করে এবং সেখান থেকে দুজন কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসে। এরপর পুলিশ উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে ওই দুই কর্মীকে ছেড়ে দেয়। এই ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করেনি।’
ইউপিএলের সম্পাদনা বিভাগের পরিচালক ফিরোজ আহমেদ আগামীর সময়কে বলেন, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে নিষিদ্ধ বই হিসেবে দাবি করে এর বিপণন বন্ধ করার দাবি জানায় কিছু লোক। আমাদের বিক্রয়কর্মীদের নিকটস্থ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের পক্ষ থেকে প্রশ্নকারীদের জানানো হয়েছে যে, বইটি নিষিদ্ধ নয়। কোনো বইকে নিষিদ্ধ করতে হলে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সকলকে অবগত করতে হয়, কিছু আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়। এই বইয়ের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। সরকার বা আদালত তেমন কোনো পদক্ষেপ নিলে ইউপিএল সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী আমাদের এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই। বাংলাদেশ সৃষ্টির ও মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের বহু প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট এই গ্রন্থ থেকে মিলবে। ইউপিএল তার প্রতিটি বই দায়িত্ব নিয়েই প্রকাশ করে। এই বইটি কোনো দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যথানিয়মে নিষিদ্ধ করলে ইউপিএল যথাযথ আইন অনুসারে কাজ করবে। তবে আমরা প্রকাশক হিসেবে, এবং বিশেষত অ্যাকাডেমিক প্রকাশক হিসেবে মনে করি, কোনো ফৌজদারি অপরাধের উস্কানি নেই, এমন কোনো বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনে হস্তক্ষেপ করাটা সংস্কৃতির সার্বিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।’
ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘বিগত আমলেও তিনটি বইকে আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ না করেই বইমেলায় তাদের স্টল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইউপিএল এই পেশাদার অবস্থান থেকেই প্রতিবাদ করেছিল। এখনও ইউপিএলের বক্তব্য একই থাকবে। রাষ্ট্র ও সমাজের বিকাশের স্বার্থেই সরকারের ও সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব হবে মুক্তচিন্তা ও বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার এই পরিসরে হস্তক্ষেপ না করা।’
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বা অন্য কোনো বই যথাযথ কর্তৃপক্ষ আইনসঙ্গতভাবে নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত ইউপিএল থেকে বইটির বিক্রি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকাশনার মতো একটা জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ একটা মাধ্যম আইনসম্মত নয় এমন চাপ বা হুমকির মুখে থাকলে তাতে দেশের সামগ্রিক সৃজনশীলতার ক্ষতি হবে। আমরা আশা করব, প্রতিটা শুভবুদ্ধির মানুষ এবং সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এই ক্ষেত্রে আমাদের পাশে থাকবেন। কিন্তু নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত আমরা বই সরাতে পারি না, এটি আমাদের নৈতিক অবস্থান।’
ইউপিএল বিভিন্ন সরকারের আমলে চাপের মুখে পড়েছে বলেও দাবি করেন ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনো চাপের মুখে পড়েছি। সরকার কিংবা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হয়েছে অমুক বা তমুক বই নিয়ে তাদের আপত্তি আছে। গণঅভ্যুত্থানের পর কোনো কোনো স্থানে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রি করা নিয়ে বাধা দেওয়া হয়েছে। আগের সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা থেকে প্রকাশিত একটা বইয়ের জন্য ইউপিএলকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয়েছিল। মওদুদ আহমেদের সবগুলো বইয়ের প্রকাশক ইউপিএল, বহু ক্ষমতাবান ব্যক্তি এগুলো প্রকাশ না করার জন্য বিভিন্ন সময়ে চাপ প্রয়োগ করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু প্রকাশক হিসেবে ইউপিএল একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করে। আমাদের রিভিউয়াররা স্বাধীনভাবে প্রতিটি বই যাচাই করেন, তাদের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতেই ইউপিএল প্রতিটি বই প্রকাশ করে। ফলে কোনো চাপের কারণেই ইউপিএল তার কোনো বই সরিয়ে নেয় না। গত আমলের মতো এখনও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিজ্ঞাপনও ইউপিএলের পেজ থেকে নিয়মিত দেওয়া হয়। এই পেশাদারিত্বের নীতির কারণে ইউপিএল বহুভাবে বাণিজ্যিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু কখনোই প্রকাশনার এই মৌলিক মানদণ্ড থেকে সরে আসেনি।’
সম্প্রতি ব্যারিস্টার রাজ্জাকের লেখা জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসবিষয়ক একটি গ্রন্থ প্রকাশের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের রিভিউয়াররা এই বইটিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আছে বলে মতামত দেওয়ার প্রেক্ষিতেই আমরা এই বইটি প্রকাশ করেছি। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান যাই থাকুক, প্রকাশক হিসেবে এটাই পেশাদারিত্বের নীতি। আমরা মনে করি, এই নৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসলে প্রকাশনা শিল্পে যুক্ত থাকার কোনো অর্থ হয় না। আমাদের প্রকাশিত যেকোনো গ্রন্থ সম্পর্কে এটিই আমাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।’




