রাজবাড়ীতে বাড়ছে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব

রাজবাড়ীতে প্রতিনিয়ত বেওয়ারিশ কুকুরের কামড় ও হামলার শিকার হচ্ছেন মানুষ ও গৃহপালিত পশু। ছবি: আগামীর সময়
বাড়ির সামনে খেলছিল তিন বছরের শিশু সাবরিনা। হঠাৎ দলবেঁধে কয়েকটি বেওয়ারিশ কুকুর তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কুকুরগুলো তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে মাংস ছিঁড়ে নেয়। চিৎকার শুনে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করেন। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসার পর নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে প্রায় এক মাস চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাকে। শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হলেও কুকুরের সেই আতঙ্ক এখনো কাটেনি।
শুধু সাবরিনা নয়, রাজবাড়ীতে প্রতিনিয়ত বেওয়ারিশ কুকুরের কামড় ও হামলার শিকার হচ্ছেন মানুষ ও গৃহপালিত পশু। বিশেষ করে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেশি। দলবদ্ধ কুকুরের ভয়ে অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হতে চান না। শিশুদের স্কুলে পাঠাতেও উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা। একই সঙ্গে ছাগলসহ বিভিন্ন গৃহপালিত পশুর ওপরও হামলা চালাচ্ছে কুকুরের দল।
জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ীতে বছরে প্রায় ৮ হাজার মানুষ কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের শিকার হচ্ছেন। পাশাপাশি দুই হাজারের বেশি গৃহপালিত পশু কুকুরের আক্রমণের শিকার হচ্ছে।
বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত হয়ে জলাতঙ্কের টিকা নিয়েছেন ৭৫৬ জন। আর কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত একই ধরনের ঘটনায় টিকা নিয়েছেন ৯৫৩ জন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুকুর নিধন বন্ধ থাকা, জনবল সংকট ও বরাদ্দ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে কুকুরের বন্ধ্যাত্বকরণ কার্যক্রম। এতে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি উপদ্রবও বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক বাড়ছে।
কালুখালী উপজেলার তোফাদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও শিক্ষক মোবারক আলী জানিয়েছেন, তার তিন বছর বয়সী মেয়েকে একদল কুকুর তাকে আক্রমণ করে। প্রায় এক মাস ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
মোবারক আলী আরও জানালেন, কুকুরগুলো দলবদ্ধভাবে চলাচল করে এবং হামলা করে দ্রুত পালিয়ে যায়। তার স্কুলপড়ুয়া ছেলেকেও একবার কুকুর ধাওয়া করেছিল। এখন সে সহপাঠীদের সঙ্গে স্কুলে যায় এবং কুকুরের ভয়ে হাতে লাঠি রাখে। শুধু শিশুরাই নয়, ছাগলসহ গৃহপালিত পশুও কুকুরের হামলার শিকার হচ্ছে।
বালিয়াকান্দি সদরের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় কয়েকজনের বাড়ির ছাগলকে কুকুর কামড়েছে। হামলার পর কুকুরগুলো ছাগলকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। দু-একদিন দেখা না গেলেও কয়েকদিন পর আবার দলবেঁধে ঘুরতে দেখা যায়। এতে শিশু ও গবাদিপশু নিয়ে তারা আতঙ্কে থাকেন।
বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সন্তানকে নিয়ে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। রাস্তায় বের হলেই দলবদ্ধ কুকুরের কারণে ভয় কাজ করে। গৃহপালিত পশু একা পেলেই কুকুরগুলো আক্রমণ করে। তাই শিশুদেরও বাইরে পাঠাতে ভয় হয়।
তালপট্টির বাসিন্দা জাকির হোসেন পাটোয়ারী জানিয়েছেন, বাড়তি আয়ের আশায় তিনি ছাগল পালন করতেন। তার তিনটি ছাগলের মধ্যে একটিকে বাড়ির পাশে কুকুরের দল আক্রমণ করে গুরুতর জখম করে। দুই দিন চিকিৎসা দেওয়ার পরও ছাগলটিকে বাঁচানো যায়নি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ফারুক হোসেন জানিয়েছেন, প্রতি মাসে শত শত মানুষ কুকুরের কামড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে আসছেন। তাদের জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু টিকা দিয়ে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বন্ধ্যাত্বকরণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস আগামীর সময়কে বললেন, একসময় প্রকল্পের মাধ্যমে কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হতো। পৌরসভা থেকেও নিধন ও বন্ধ্যাত্বকরণ কার্যক্রম চালু ছিল। দীর্ঘদিন ধরে এসব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তাদের নিজস্ব কোনো প্রকল্প বা বাজেট নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো প্রকল্প নেওয়া হলে জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে সহযোগিতা করা হবে।
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, কুকুর নিধনের বিষয়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই নিধনের সুযোগ নেই। কুকুরের টিকাদান ও বন্ধ্যাত্বকরণের বিষয়ে উপজেলা পরিষদের তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।




