শিক্ষাজীবন শেষের আগেই লাখ টাকার চাকরি ৪০ তরুণের
- জার্মান, চীনা ও থাই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা মেরিন একাডেমিতে এসে প্রথমবারের মতো নেন ইন্টারভিউ
- ইন্টারভিউ ও ল্যাব টেস্ট দিয়েছেন ৬০ জন
- ৪০ জন নিয়োগপত্র পাবেন অনলাইনে

প্রতীকী ছবি
পড়াশোনা এখনো শেষ হয়নি, হাতে পাননি ডিগ্রির চূড়ান্ত সনদ। এর আগেই ঝুলিতে যোগ হচ্ছে বহুজাতিক শিপিং কোম্পানির চাকরির নিয়োগপত্র। বিশাল মহাসাগরে জাহাজের স্টিয়ারিং হাতে কিংবা ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন যাদের চোখে, সেই স্বপ্ন যেন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে গ্র্যাজুয়েশনের আগেই। অবিশ্বাস্য এ ঘটনা ঘটেছে গত শুক্রবার বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি ক্যাম্পাসে।
একাডেমির প্রাঙ্গণে শেষ হয়েছে বিশ্বের তিনটি শীর্ষ শিপিং ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির সরাসরি সাক্ষাৎকার পর্ব। ইন্টারভিউ দিতে কোম্পানির দুয়ারে কিংবা বিদেশ পাড়ি দিতে হয়নি ক্যাডেটদের। কোনো এজেন্সির পেছনেও দৌড়াতে হয়নি। উল্টো বিদেশি কোম্পানির বড় কর্তারা উড়োজাহাজে চট্টগ্রাম এসে একাডেমির প্রশাসনিক ভবনে বসে ইন্টারভিউ নিয়েছেন। ৬০ জন চৌকস ক্যাডেট সরাসরি ইন্টারভিউ ও ল্যাব টেস্ট দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৪০ ক্যাডেট সরাসরি নিয়োগপত্র পেয়ে যাবেন অনলাইনে। ডিসেম্বরে কোর্স শেষ করে এক বছরের জন্য শিক্ষানবিশ পদে বিদেশি জাহাজে চাকরি শুরু তাদের। বেতন হবে মাসিক ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ডলার (টাকায় ৬০ হাজার থেকে দেড় লাখ)। ভালো পারফর্ম করলে বিশ্বসেরা কোম্পানির জাহাজেই ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার বা জুনিয়র অফিসার হিসেবে আড়াই হাজার থেকে চার হাজার ডলারে (টাকায় ৩ লাখ ১২ হাজার থেকে ৫ লাখ) চাকরি শুরু করবেন এই ক্যাডেটরা।
বাংলাদেশে যখন একটি সাধারণ চাকরির জন্যও লাখো বেকারের হাহাকার। তখন পাস করার আগেই ক্যাম্পাসে এসে বিদেশি কোম্পানির চাকরি দেওয়ার ঘটনা এই প্রথম। বিস্ময়করও বটে। জাহাজ পরিচালনায় যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি উদাহরণ। বৈশ্বিক মেরিন সেক্টরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে বিরাট মাইলফলক। মেরিন একাডেমি, একাডেমির অ্যালামনাইয়ের নিরলস চেষ্টায় এতবড় অর্জন— বলছেন একাডেমির কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীম। বললেন, ‘লাগাতার যোগাযোগ, অ্যাকাডেমিক মান, ক্যাডেট সক্ষমতার কথা জেনে বিশ্বমানের এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তারা ক্যাম্পাসে এলেন। শুরুটা আমাদের ভালো হলো।’
যে তিন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পেয়েছেন মেরিন একাডেমি ক্যাডেটরা, তাদের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। সেগুলো হলো, বিশ্বখ্যাত জার্মানি শিপিং কোম্পানি ‘বার্নার্ড শুলতে শিপ ম্যানেজমেন্ট’ (বিএসএম)। চীনের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান ‘হুয়ায়াং মেরিটাইম সেন্টার’। থাইল্যান্ডের ‘নাথালিন শিপিং প্রাইভেট লিমিটেড’। এই তিন কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রথমবার মেরিন একাডেমিতে এসে ইন্টারভিউ নেন।
বিএসএম গ্রুপের মেরিন ডিরেক্টর (এইচ আর) সোফ্রোনিস থ্রিওডোসিও ইন্টারভিউ শেষ আগামীর সময়কে বললেন, ‘ক্যাডেটদের পারফরম্যান্সে আমরা অভিভূত। আশা করছি ভালো কিছু হবে।’
জার্মানভিত্তিক বিএসএমের পরিচালনায় বিশ্ব জুড়ে সাড়ে সাতশ আধুনিক জাহাজ আছে। ৩০টিরও বেশি দেশে ১০টি প্রধান শিপ ম্যানেজমেন্ট সেন্টার, ৩৫টির বেশি ক্রু সার্ভিস সেন্টার এবং ছয়টি নিজস্ব মেরিন ট্রেনিং সেন্টার নিয়ে কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৫ হাজার নাবিক ও ক্রু কর্মরত।
এসব নিয়োগে মেরিন একাডেমির অ্যালামনাইরা বড় ভূমিকা রাখছেন। বিএসএমেএ ফ্লিট পার্সোনেল ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন একাডেমি অ্যালামনাই ৩২ ব্যাচের ক্যাপ্টেন রাহাত সুমন। তিনি বললেন, ‘আমাদের ক্যাডেটদের সুনাম বিশ্বজোড়া। বিএসএমের মতো বড় কোম্পানিতে কানেক্ট করাটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল। এবার ১০ ক্যাডেট নিয়োগ পেতে যাচ্ছে। আগামীবার এই সংখ্যা আরও বাড়বে। কতজন বাড়বে, সেটি নির্ভর করছে এখনকার ক্যাডেটদের ভালো পারফরম্যান্সের ওপর।’
হুয়ায়াং মেরিটাইম সেন্টার চীনের বৃহত্তম নাবিক সরবরাহকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রায় দুইশর বেশি সামুদ্রিক জাহাজের পরিচালনা এবং বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনে একযোগে ১২ হাজারের বেশি নাবিক এবং মেরিন অফিসার সরবরাহ করার এক বিশাল নেটওয়ার্ক তাদের। সেই প্রতিষ্ঠানে এই প্রথম কাজ করার সুযোগ তৈরি হলো মেরিন একাডেমি ক্যাডেটদের।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নিয়োগে সমন্বয় করেছেন একাডেমির ৩৩ ব্যাচের ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি জানালেন, ‘চীনের বাজার বিশাল ও সম্ভাবনাময়। বাজার ধরতে এরই মধ্যে ক্যাডেটদের চীনা ভাষা শেখানো হচ্ছে। ক্যাডেটদের ইন্টারভিউতে কোম্পানি কর্তারা বেশ সন্তুষ্ট। এবার আমরা ১০ জন নিচ্ছি। এই সংখ্যা আরও বাড়বে।’
সিঙ্গাপুর ভিত্তিক নাথালিন শিপিং মূলত থাইল্যান্ডের অন্যতম বৃহৎ তেল পরিবহন ও মেরিটাইম শিল্পগোষ্ঠী ‘নাথালিন গ্রুপ’-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। জ্বালানি তেল পরিবহনে এই অঞ্চলে শীর্ষে থাকা এই গ্রুপে ৫০টিরও বেশি সমুদ্রগামী জাহাজ আছে। যেখানে ২ হাজারের বেশি নাবিক ইঞ্জিনিয়ারের কাজ করছেন। সেই প্রতিষ্ঠানও এবার মেরিন একাডেমি থেকে ক্যাডেট নিচ্ছে। কিন্তু সংখ্যা জানাননি কোম্পানির সিঙ্গাপুর অফিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন এমদাদ।
বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি ক্যাডেটদের পড়ালেখা ও প্রশিক্ষণ আন্তর্জাতিক মানের নিশ্চিত হলেও ভিসা জটিলতা এবং জাহাজে সি ট্রেনিং যথাসময়ে নিশ্চিত না হওয়ায় বিখ্যাত শিপিং কোম্পানিতে চাকরিতে প্রবেশ সীমিত হয়ে পড়েছিল। এ ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত শিপিং কোম্পানিতে একাডেমি ক্যাডেটদের চাকরি নিশ্চিতে উদ্যোগী ভূমিকা রাখার সিদ্ধান্ত নেন অ্যালামনাইরা। এখন ধীরে ধীরে এর সুফল আসতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বললেন, ‘অনেক ধাপ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বড় প্ল্যাটফর্মে ওঠার সুযোগ তৈরি হলো। এই নিয়োগ বাংলাদেশি মেরিনারদের দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতার এক বড় প্রমাণ। ক্যাডেটরা সুনাম ছড়ালে বিশ্বজোড়া আরও প্রতিষ্ঠানে চাকরি সম্ভব হবে।’
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত এই একাডেমির ৫ হাজারের বেশি ক্যাডেট বিশ্ব জুড়ে জাহাজ পরিচালনায় সাগরে ও স্থলভাগে যুক্ত আছেন।



