পথশিশুদের স্বপ্নসারথি মিজানুর

পাঠশালায় পড়াচ্ছেন মিজানুর
ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে জ্বলছে শিক্ষার আলো। স্বপ্ন দেখতে শিখছে শতাধিক পথশিশু। যার অনেকেরই একসময় ঠিকানা ছিল ফুটপাত কিংবা শহরের অলিগলি। দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের কারণে যাদের কাছে শিক্ষার সুযোগ ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে এসেছেন শাহ মো. মিজানুর রহমান সোহেল।
হবিগঞ্জ শহরের রাজনগর এলাকায় পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য তিনি গড়ে তুলেছেন ‘আমরাও মানুষ পাঠশালা’। সেখানে পড়াশোনা করছে ১১০ শিশু।
শুধু পড়াশোনাই নয়, শিশুদের বিনামূল্যে বই, খাতা, কলমসহ শিক্ষা উপকরণ দেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিদিন তাদের খাবারেরও ব্যবস্থা করেন। পাঠ্যবইয়ের শিক্ষার পাশাপাশি শেখানো হয় নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ।
মিজানুর রহমানের স্বপ্ন— হবিগঞ্জ শহরে একটি স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলা, যেখানে পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য থাকবে নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার পরিবেশ।
শহরের রাজনগর এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করেন মিজানুর রহমান (৪৪)। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘এখানে ১১০ জন শিশু পড়াশোনা করে। তারা সবাই আমার ছেলেমেয়ে। তাদের আমি পড়াশোনা করাই। আমার উদ্দেশ্য, প্রত্যেক সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশু যেন অন্তত অক্ষরজ্ঞান লাভ করতে পারে। আশা করি, একসময় অনেকে স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠে পড়ার সুযোগ পাবে। এরই মধ্যে কয়েকজন শায়েস্তাগঞ্জের ওলিপুর শিল্পাঞ্চলের পোশাক কারখানায় চাকরি করছে।’
তবে একার পক্ষে এত বড় মানবিক কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন বলে জানালেন তিনি। তার উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নিতে সমাজের বিত্তবান, প্রবাসী, সমাজসেবক ও দানশীল ব্যক্তিদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মিজানুর রহমান।
শুরুটা ২০১৯ সালে। তখন জায়গা কিনে প্লট বিক্রির ব্যবসা করতেন মিজানুর। তার স্ত্রী রোজী আবেদীন চাকরি করতেন ব্যাংকে। রেস্টুরেন্টে খাবার চাইতে গিয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের তাড়া খেতে দেখে বিষয়টি মনে দাগ কাটে মিজানুরের। তাদের ডেকে এনে খাবার কিনে দিতেন। পরে বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে প্যাকেট করে খাবার বিতরণ করতে গিয়ে দেখেন, শিশু-কিশোরদের অনেকেই মাদকে জড়িয়ে পড়ছে। সেই চিন্তা থেকেই গাছতলায় তাদের পড়ানো শুরু করেন। পরে একটি ঝুপড়ি ঘর তুলে সেখানে পাঠশালা স্থানান্তর করেন।
২০২৩ সালের দিকে রোজী চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর স্বামী-স্ত্রী মিলে অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। সেই ব্যবসার আয় থেকে দুই ছেলের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালানোর পর বেঁচে যাওয়া টাকার একটি অংশ তারা ‘আমরাও মানুষ পাঠশালা’র জন্য ব্যয় করেন। সেখানে পাঠদান করেন দুজন মিলেই।



