বিপাকে কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সম্প্রতি গণমাধ্যমে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে— দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছেন। যে পেঁয়াজ কিছুদিন আগেও ছিল এক মূল্যবান খাদ্যশস্য, তা আজ অবহেলায় ভেসে যাচ্ছে। অথচ এই বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, এমনকি মার্চ মাসেও দেশে প্রচুর পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। আমদানির ঠিক কয়েক মাসের ব্যবধানে কেন আমাদের কৃষকরা ফসলের উৎপাদন খরচটুকুও তুলতে পারছেন না, সেই সংকট গভীরভাবে তলিয়ে দেখা দরকার। এটি কেবল পেঁয়াজের সংকট নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক কৃষি বাজার ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত দুর্বলতার একটি বড় প্রতিফলন।
কৃষকদের পেঁয়াজ ফেলে দেওয়ার প্রধান কারণ হলো যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এবং তীব্র বিদ্যুৎ সংকট। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য যে ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিনগুলো দিয়েছিল, সেগুলো মাঠ পর্যায়ে অকেজো হয়ে পড়েছে। কারণ, গ্রামীণ এলাকায় দৈনিক চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে এই মেশিনগুলো চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়েই লোকসান কমানোর কোনো উপায় না দেখে কৃষক ফসল ফেলে দিচ্ছেন। ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে বিদ্যুতের আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হলেও সমস্ত লোডশেডিংয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামীণ অঞ্চলে, যা গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দারুণভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
পেঁয়াজ চাষের সঙ্গে এ দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক কৃষক জড়িত। সিংহভাগ কৃষকই চড়া সুদে ঋণ বা দাদন নিয়ে চাষাবাদ করেন। এখন বাজারে সঠিক মূল্য না পাওয়ায় তারা ঋণ শোধ করতে পারছেন না। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের ধস নামার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ভোগ (consumption) কমে গেলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে (Macroeconomy)। এই সংকট শুধু পেঁয়াজেই সীমাবদ্ধ নয়; এর আগে আমরা আলু, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি মাঠে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও দেখেছি। দেশে বিপুল জনসংখ্যার বিপরীতে চাষযোগ্য জমি সীমিত। সেখানে উৎপাদন বাড়ানোর পর উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ করতে না পারা এবং কৃষককে ন্যায্যমূল্য না দিতে পারা একটি জাতীয় অপচয়।
সরকার ‘কৃষক কার্ড’ বা কৃষিঋণ মওকুফের মতো কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিলেও তা সামগ্রিক সংকটের তুলনায় অপ্রতুল। জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে কমছে এবং যেটুকু বরাদ্দ থাকে, তার বড় অংশই চলে যায় সার ভর্তুকিতে। স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকে আমাদের কৃষিনীতির মূল ফোকাস ছিল কেবল ‘উৎপাদন বাড়ানো’। আজ খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে; কিন্তু উৎপাদনের পর ফসল কীভাবে প্রসেসিং হবে, সংরক্ষণ হবে কিংবা বাজারজাত হবে— সেই ‘ভ্যালু এডিশন’ ও বাজার অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
এখানে সরকারের একটি বড় নীতিগত ব্যর্থতা স্পষ্ট। কৃষি বিভাগের কাছে কি এই পূর্বাভাস ছিল না যে এ বছর পেঁয়াজের ফলন ভালো হবে? যদি পূর্বাভাস থেকেই থাকে, তবে দেশের পেঁয়াজ বাজারে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে (জানুয়ারি-মার্চ) কেন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলো? এই অসময়ের আমদানি বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এ ছাড়া আমরা আমদানিতে যতটা পটু, রপ্তানি বাজার তৈরিতে ততটাই পিছিয়ে। নেপাল, ভারত বা পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে যখন পেঁয়াজের দাম চড়া, তখনো আমরা আমাদের উদ্বৃত্ত পেঁয়াজ রপ্তানি করার কোনো বাজার সক্ষমতা (Market Capacity) তৈরি করতে পারিনি।
কৃষিপণ্যের কোল্ডস্টোরেজ বা সংরক্ষণাগার পরিচালনার জন্য বিদ্যুৎ একটি অন্যতম প্রধান খরচ। কিন্তু আমাদের বিদ্যুৎ খাতের নীতিগত ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে কৃষকদের। প্রতি বছর বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে (IPP) প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো বিপুল অঙ্কের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এই অনুৎপাদনশীল ব্যয়ের কারণে দেশে বিদ্যুতের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিদ্যুতের এই উচ্চমূল্যের কারণে কোল্ডস্টোরেজ পরিচালনা করা এখন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক থাকছে না, যার চূড়ান্ত দায় গিয়ে পড়ছে আলু বা পেঁয়াজচাষিদের ওপর।
এই সংকট উত্তরণে সরকারকে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। রাষ্ট্র নিজে ব্যবসা করবে বা কোল্ডস্টোরেজ চালাবে— এমনটা প্রত্যাশিত নয়। সরকারের মূল কাজ হবে বেসরকারি খাত, যাতে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংরক্ষণাগার শিল্পে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হয়, তেমন একটি অনুকূল পরিবেশ ও অবকাঠামো তৈরি করা।
বেসরকারি খাতের হাতে এই দায়িত্ব ছেড়ে দিলে ‘সিন্ডিকেট’ বা মনোপলি তৈরির যে শঙ্কা থাকে, তা দূর করার দায়িত্বও সরকারের। এ জন্য ‘কম্পিটিশন পলিসি’ বা প্রতিযোগিতা নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। লাইসেন্স বা ব্যবসার সুযোগ যেন কেবল গুটি কয়েক অলিগার্ক বা সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাজার উন্মুক্ত করে দিলে এবং হাজার হাজার বিনিয়োগকারী এগিয়ে এলে মনোপলি ভেঙে যাবে। ভোজ্য তেল বা চিনির মতো কৃষি সংরক্ষণ খাতে যেন কোনো সিন্ডিকেট তৈরি না হতে পারে, সেদিকে সরকারকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।
সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) অর্থনৈতিক সমাজ গঠনের কথা বলছে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক সমাজ গঠন করতে হলে গ্রাম ও শহরের এই বৈষম্য দূর করতে হবে। আগামী দিনের কৃষিকে টেকসই করতে হলে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ জরুরি—
কৃষি বীমা (Crop Insurance): প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আকস্মিক মূল্যধসের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর কৃষি বীমা চালু করা প্রয়োজন। কৃষি কমিশন গঠন: পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মতো বাংলাদেশেও একটি স্বাধীন কৃষি কমিশন গঠন করা দরকার, যা প্রতি বছর ফসলের উৎপাদন খরচ এবং বাজারমূল্যের ভারসাম্য পর্যবেক্ষণ করে কৃষকদের জন্য একটি ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্য’ (Minimum Support Price) নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। মার্কেট ইন্টেলিজেন্স ও তথ্য সরবরাহ: কৃষকদের সঠিক সময়ে বাজারের তথ্য এবং আমদানির পূর্বাভাস দিতে হবে, যাতে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। রপ্তানিমুখী কৃষিনীতি: শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভর না করে আমাদের কৃষিপণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে প্রসেসিং ও প্যাকেজিং শিল্পের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ এবং সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি কৃষিনীতি প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, প্রতি বছর ফলন বেশি হলে কৃষক কাঁদবে, আর ফলন কম হলে ভোক্তা কাঁদবে— এই দুষ্টচক্র থেকে আমরা কখনোই বের হতে পারব না। এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে উৎপাদন ও বাজার— দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। আগামী দিনের কৃষিনীতির সাফল্য নির্ভর করবে কত দক্ষতার সঙ্গে আমরা এই রূপান্তর ঘটাতে পারি।
লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ





