এফবিআই ফাইলস
বিমান ছিনতাই

এ ঘটনার খলনায়ক ছিলেন ছদ্মনামে এক ব্যক্তি, যাকে পুরো বিশ্ব চেনে ‘ডিবি কুপার’ নামে।
যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর, ঘটেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় এবং দুঃসাহসিক অপরাধগুলোর একটি। থ্রিলার সিনেমার গল্পকেও হার মানানো এ ঘটনার খলনায়ক ছিলেন ছদ্মনামে এক ব্যক্তি, যাকে পুরো বিশ্ব চেনে ‘ডিবি কুপার’ নামে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআইয়ের ইতিহাসে এটিই একমাত্র বিমান অপহরণের ঘটনা, যার রহস্য গত সাড়ে পাঁচ দশকেও উন্মোচিত হয়নি।
ঘটনার শুরু পোর্টল্যান্ড থেকে সিয়াটেলগামী নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইনসের ৩০৫ নাম্বার ফ্লাইটে। উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর মাঝবয়সী এক শান্ত ভদ্রলোক, যিনি নিজের নাম বুক করেছিলেন ‘ড্যান কুপার’ (পরবর্তীকালে গণমাধ্যমের ভুলে যা ডিবি কুপার নামে পরিচিত পায়), বিমানের এক নারী কর্মীকে ডেকে একটি চিরকুট দেন। চিরকুটে লেখা ছিল— তার ব্যাগে বোমা আছে এবং তিনি বিমানটি উড়িয়ে দেবেন। কুপারের দাবি ছিল সুনির্দিষ্ট, ২ লাখ ডলারের নগদ টাকা (সব ২০ ডলারের নোটে), চারটি প্যারাশুট এবং সিয়াটলে বিমান অবতরণের পর সেখানে একটি ফুয়েলিং ট্রাক প্রস্তুত রাখা।
সিয়াটল বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণ করার পর কুপারের দাবি মেনে টাকা ও প্যারাশুট বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বিনিময়ে তিনি বিমানের ৩৬ জন যাত্রীকে অক্ষত অবস্থায় মুক্তি দেন। এরপর কুপার বিমানটিকে পুনরায় ওড়ানোর নির্দেশ দেন এবং পাইলটদের নেভাদার রেনো শহরের দিকে যাওয়ার কথা বলেন। এবার বিমানে শুধু পাইলটরা এবং কুপার নিজে ছিলেন। বিমানটি যখন ওয়াশিংটনের আরিয়েল শহরের ওপর দিয়ে ঝড়-বৃষ্টি আর কুয়াশার মধ্য দিয়ে উড়ছিল, ঠিক তখন ঘটে মূল ঘটনা। রাত আনুমানিক ৮টা ১৩ মিনিটে, কুপার বিমানের পেছনের দরজা এবং সিঁড়িটি খুলে প্রায় ১০ হাজার ফুট উচ্চতায়, হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস আর প্রবল বৃষ্টির মধ্যে, ২ লাখ ডলারের ব্যাগ পিঠে বেঁধে প্যারাশুট নিয়ে তিনি চলন্ত বোয়িং ৭২৭ বিমান থেকে নিকষকালো অন্ধকারে লাফিয়ে পড়েন। এরপর শুরু হয় মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম অনুসন্ধান অভিযান। এফবিআই এ তদন্তের কোডনেম দেয় ‘নোরজ্যাক’।
সন্দেহভাজনদের তালিকায় রিচার্ড ম্যাককয় নামের এক অভিজ্ঞ প্যারাট্রুপারের নাম ওপরের দিকে ছিল, যিনি কুপারের ঘটনার ঠিক চার মাস পর একই কায়দায় একটি বিমান অপহরণ করেছিলেন। কিন্তু এফবিআই শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি যে ম্যাককয়ই কুপার ছিলেন কি না।
এই দীর্ঘ তদন্তের ইতিহাসে একমাত্র বড় অগ্রগতি আসে ১৯৮০ সালে। ব্রায়ান ইনগ্রাম নামের আট বছর বয়সী এক শিশু ওয়াশিংটনের কলম্বিয়া নদীর তীরে বালুর নিচে চাপা পড়া অবস্থায় ৫ হাজার ৮০০ ডলারের একটি বান্ডিল খুঁজে পায়। নোটগুলোর সিরিয়াল নাম্বার পরীক্ষা করে এফবিআই নিশ্চিত হয়, এগুলো কুপারকে দেওয়া সেই মুক্তিপণের টাকারই অংশ ছিল। কিন্তু এই সূত্রও কুপারের আসল পরিচয় বা তার জীবিত থাকার প্রমাণ দিতে পারেনি।
কুপার কি সেই রাতে বেঁচেছিলেন? বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, তীব্র ঠান্ডা, ঝোড়ো হাওয়া এবং দুর্গম পাহাড়ি বনাঞ্চলের কারণে প্যারাশুট নিয়ে নিরাপদে অবতরণ করা কুপারের পক্ষে অসম্ভব ছিল। হয়তো লাফ দেওয়ার পরপরই তার মৃত্যু হয়েছিল। অন্যপক্ষের ধারণা, কুপার ছিলেন একজন অভিজ্ঞ সেনাসদস্য বা প্যারাট্রুপার, যিনি নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে এবং নতুন পরিচয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন বাকি জীবন।
টানা ৪৫ বছর নিরলস তদন্ত, হাজারো সন্দেহভাজন এবং অসংখ্য তত্ত্ব খতিয়ে দেখার পর, ২০১৬ সালে এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে এ মামলার ফাইল বন্ধ ঘোষণা করে।




