তৃণমূলে কোন্দলের শঙ্কায় বিএনপি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজশাহীর বাঘা উপজেলা। বিএনপির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী একজন নন, দুজনও নন— অন্তত পাঁচজন। সবাই দীর্ঘদিনের নেতা। কারও রয়েছে আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস, কারও রয়েছে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি, আবার কেউ এলাকায় জনপ্রিয় মুখ। সবাই এখন নিজ নিজ সমর্থকদের নিয়ে মাঠে। চলছে গণসংযোগ। বাড়ছে কর্মিসভা। দলীয় সমর্থন পাওয়ার আশায় বাড়ছে তৎপরতাও। তবে একই সঙ্গে বাড়ছে নীরব প্রতিযোগিতা। স্থানীয় নেতাদের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত একজনকে সমর্থন দিলে অন্যদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। সেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে তৃণমূল সংগঠনেও।
শুধু বাঘা নয়, এমন চিত্র এখন দেশের অনেক উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও সিটি করপোরেশনে। কোথাও চারজন, কোথাও পাঁচজন, আবার কোথাও তারও বেশি বিএনপি নেতা একই পদে দলীয় সমর্থনের প্রত্যাশায় মাঠে রয়েছেন। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে জেলা শহরের পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ কিংবা ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদ— প্রায় সব ক্ষেত্রেই একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী সক্রিয়। তারা নিজ নিজ অবস্থান শক্ত করতে জনসংযোগ, সামাজিক কার্যক্রম এবং সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন আর শুধু প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়; একই দলের নেতাদের মধ্যেও নীরব প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যক্তিনির্ভর হওয়ায় একই এলাকায় একাধিক যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নেতা থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজনকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্তই সবচেয়ে কঠিন। কারণ, সমর্থন না পাওয়া নেতাদের ক্ষোভ সামাল দেওয়া, কর্মী-সমর্থকদের ঐক্য ধরে রাখা এবং ভোট বিভক্তি ঠেকানো— সবকিছুই একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। তাই আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে বিএনপির সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে প্রতিটি পদে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা এবং তৃণমূলে কোন্দল এড়িয়ে সবাইকে একই ছাতার নিচে রাখা।
গত ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন হবে বিএনপি সরকারের অধীনে প্রথম কোনো নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার ভাষ্য, ‘এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে গণতন্ত্রের ভিত্তি যাতে মজবুত হয়, সেটিই দেখতে চান সরকারপ্রধান। সেজন্য তিনি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চান।’ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে এরই মধ্যে আভাস দিয়েছে বিএনপি।
১১ দলীয় ঐক্য থাকলেও জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এরই মধ্যে পৃথকভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ঢাকার দুই সিটিসহ আটটিতে প্রাথমিকভাবে মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। ঢাকার দুই সিটিসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে দলসমর্থিত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে এনসিপিও।
বিএনপির চ্যালেঞ্জ একক প্রার্থী নিশ্চিত করা
দেশে বর্তমানে ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টির অধিক পৌরসভা এবং ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা ও ইউপি চেয়ারম্যান এবং সিটি করপোরেশন ও পৌর মেয়র পদে সারা দেশে স্থানীয়ভাবে বিএনপির একাধিক শক্তিশালী নেতা রয়েছেন। কাউন্সিলর পদেও আগ্রহ রয়েছে একাধিক প্রার্থীর। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে ইচ্ছুক বিএনপির স্থানীয় নেতারা গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লা ও হাট-বাজারে বেশি সরব রয়েছেন। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিপক্ষ নয়, নিজেদের মধ্যে সমন্বয়কেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে বিএনপি।
যেমন, রাজশাহীর বাঘা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হলে বিএনপি থেকে অন্তত পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগ্রহী। তারা হলেন বাঘা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখরুল হাসান বাবলু, বাঘা পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুরুজ্জামান সুরুজ, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম, জেলা বিএনপির সদস্য রোকনুজ্জামান মানিক এবং জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সালাউদ্দিন আহমেদ শামীম সরকার।
একইভাবে যশোরের কেশবপুর পৌরসভা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএনপির একাধিক নেতা।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডগুলোতেও বিএনপির প্রার্থীর ছড়াছড়ি। দক্ষিণ সিটির ৯ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির সমর্থনে অন্তত তিনজন কাউন্সিলর প্রার্থী হতে চান। তারা হলেন ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আহম্মদ আলী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের সদস্য হাবিবুল্লাহ মাহবুব এবং মতিঝিল থানা বিএনপির সদস্য আনোয়ার হোসেন আনু। এমনিভাবে, ঢাকা উত্তর সিটির বৃহত্তর ২ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি থেকে কাউন্সিলর প্রার্থী হতে চান অন্তত চার নেতা। তারা হলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মীর ইমরান হোসেন মিথুন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সাজ্জাদ হোসেন, ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোস্তফা সরকার এবং পল্লবী থানা যুবদলের সাবেক সভাপতি রাজিব হোসেন পিন্টু।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা ঠিক করতেও হিমশিম খেতে হবে বিএনপিকে। যেমন, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির অন্তত পাঁচজন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। তারা হলেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহাদাত হোসেন শাহা, সাধারণ সম্পাদক খাদেমুল ইসলাম, ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক স্বপন মাহমুদ, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম এবং ইউনিয়ন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ইউপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জয়নুল আবেদীন।
সিটি করপোরেশনেও প্রতিযোগিতা কম নয়। ঢাকা উত্তর সিটিতে বিএনপি থেকে মেয়র পদে অন্তত ছয়জন নির্বাচন করতে চান। বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ছাড়াও সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সাবেক সভাপতি এমএ কাইয়ূম, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব মোস্তফা জামান, যুগ্ম আহ্বায়ক (দপ্তর) এবিএমএ রাজ্জাক এবং আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক এম কফিল উদ্দিন আহমেদ। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালামের পাশাপাশি দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, সাবেক ডেপুটি মেয়র কাজী আবুল বাশার, জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না এবং মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসও বিএনপির সমর্থনপ্রত্যাশী।
দুই মাসের মধ্যে প্রার্থী বাছাই
বিএনপির সূত্রে জানা গেছে, আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চায় দলটি। উপজেলা ও পৌর ইউনিটের মতামত, জেলা নেতাদের পরামর্শ এবং নিজস্ব খোঁজ-খবরের ভিত্তিতে সাংগঠনিক সম্পাদকরা এ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করবেন। পরে সেই তালিকা দলের হাইকমান্ডের কাছে জমা দেওয়া হবে। এলাকায় জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা— এই তিনটি মানদণ্ডের ভিত্তিতেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়া হবে। যারা এই তিন মানদণ্ড পূরণ করছেন, তাদের অনেককে এরই মধ্যে এলাকায় কাজ করার প্রাথমিক নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হলেও এবার নির্বাচন হবে নির্দলীয়ভাবে। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের কেন্দ্রীয়ভাবে এবং উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়র প্রার্থীদের কেন্দ্রের নির্দেশনায় স্থানীয়ভাবে সমর্থন দেওয়া হতে পারে।
বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত আগামীর সময়কে বললেন, বিএনপি এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে। তাই তারা উৎসবমুখর পরিবেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়। জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার ভিত্তিতে যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হবে।
জানা গেছে, বর্তমান দলীয় প্রশাসকদেরই সিটি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী করতে পারে বিএনপি। সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটিসহ ১১টি সিটিতে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মাঠ গোছানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় প্রায় একশ নেতাকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। তাদের সমর্থন করায় তৃণমূলের আরও প্রায় পাঁচশ নেতাকর্মীকেও তখন বহিষ্কার করা হয়। এসব বহিষ্কারাদেশ এখনো প্রত্যাহার হয়নি। ফলে অনেক জায়গায় তৃণমূল কার্যত বিভক্ত। ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন এলাকায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলও দৃশ্যমান হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিটি জায়গায় গড়ে তিন থেকে চারজন করে নেতা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
তবে প্রতিটি জায়গায় দলের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলেও একক প্রার্থী নির্ধারণকে বড় সংকট হিসেবে দেখছেন না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, নির্দলীয় নির্বাচনে অনেকের আগ্রহ থাকাটা স্বাভাবিক। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই অনেকে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে সরে দাঁড়াবেন। ফলে শেষ পর্যন্ত একক প্রার্থী নির্ধারণে তেমন কোনো সমস্যা হবে না।




