ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিক্রমপুর নিয়ে আমার আবেগ-উচ্ছ্বাস সীমাহীন। এ অঞ্চলে জন্ম নিয়েছি বলে কিছুটা গৌরব ও অহংকারবোধ করি। সম্ভবত এ কারণে বিক্রমপুর নিয়ে কোথায় কী লেখা হলো, কার কোন বইতে বিক্রমপুরের উল্লেখ আছে, কিংবা এ অঞ্চলের পটভূমিতে কোন বই লেখা হয়েছে, আমি সেই সবের খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করি। কোন বিখ্যাত লেখকের বাড়ি বা পূর্বপুরুষের ভিটা বিক্রমপুরে সেসবও জানার চেষ্টা করি। আমার অতিপ্রিয় কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্বপুরুষ বিক্রমপুরের। তার পৈতৃক গ্রাম মালপদিয়া, মায়ের গ্রাম গাওদিয়া। গাওদিয়ার পটভূমিতে মানিক লিখেছেন তার কালজয়ী উপন্যাস ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। মানিক তার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস দুটোই বিক্রমপুরের পটভূমিতে লিখেছেন। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ ও ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। ১৯৩৬ সালে এ দুটো উপন্যাস লেখা হয়। তখন তার বয়স আটাশ বছর। মানিকের জন্ম ভারতের সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে। তিনি কখনো বিক্রমপুরে এসেছেন, এমন ইতিহাস নেই। পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরিসূত্রে টাঙ্গাইলে ছিলেন অনেক বছর। মানিক সেখানে তার মা নিরদা দেবীকে হারান। ডাবল নিমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে নিরদা দেবীর মৃত্যু হয়। ‘পদ্মানদীর মাঝি’ ও ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় মানিক কিছু গ্রামের উল্লেখ করেছেন। যেমন ‘পদ্মানদীর মাঝি’তে লিখেছেন, কেতুপুর, আকুরটাকুর, সুবচনির হাট, এইসব গ্রামের কথা। কিন্তু বিক্রমপুরে কেতুপুর নামে কোনো গ্রাম নেই। আকুরটাকুর গ্রাম বা পাড়াটি টাঙ্গাইলে, সুবচনি বিক্রমপুরে। অন্যদিকে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ বিক্রমপুরের গাওদিয়ার পটভূমিতে লেখা। এই উপন্যাসে বাজিতপুরের উল্লেখ আছে কিন্তু বাজিতপুর টাঙ্গাইলে। তার মানে উপন্যাস লিখতে গিয়ে তিনি বিক্রমপুর ও টাঙ্গাইলে যেসব গ্রাম বা হাটের উল্লেখ করেছেন, সেগুলো তার স্মৃতিতে ছিল। উপন্যাস লিখছেন বিক্রমপুরের পটভূমিতে, কিন্তু গ্রাম ও কোনো কোনো হাট টাঙ্গাইলের।
প্রায় দেড়শ বছর আগে বিক্রমপুরের ইতিহাস লিখেছিলেন শ্রীযোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত। গ্রন্থটি দুখণ্ডে লেখার পরিকল্পনা ছিল তার। দ্বিতীয় খণ্ড লিখে উঠতে পারেননি। ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ এক অমূল্য গ্রন্থ। এই ইতিহাসবিদ ‘বিক্রমপুর বার্তা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। বেশ কয়েক বছর পত্রিকাটি নিয়মিতই প্রকাশিত হয়েছে। তার বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের মূলচর গ্রামে। বেজগাঁও গ্রামের হিমাংশুমোহন চট্টোপাধ্যায় চার খণ্ডে ‘বিক্রমপুর’ নামে ইতিহাস গ্রন্থ সংকলিত করেছিলেন। সে এক মহাগ্রন্থ। তাদের বাড়ি পরিচিত ছিল ‘বড়বাড়ি’ নামে। বাড়ির পাশেই বিশাল দীঘি, দীঘির পাড়ে সতীঠাকুরনের মন্দির। বিক্রমপুর অঞ্চলে সতীদাহপ্রথার একমাত্র সাক্ষী হয়ে মন্দিরটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ‘বড়বাড়ি’ এখন ভগ্নস্তূপ।
বাংলাদেশের কয়েকজন ইতিহাসপ্রেমী মানুষও বিক্রমপুরের ইতিহাস লিখেছেন। যেমন, সিরাজুল ইসলাম লেলিন, স্বপন দাশগুপ্ত, মো. আজহারুল ইসলাম চার খণ্ডে লিখেছেন, ‘বিক্রমপুর: ইতিহাস ও ব্যক্তিত্ব’। দুটি চমৎকার পুস্তিকা রচনা করেছেন মো. শাহজাহান মিয়া। ‘মানিকের খোঁজে বিক্রমপুর’ ও ‘অঘোরনাথ ও স্বভাব-কবির খোঁজে বিক্রমপুর’। এই পুস্তিকা দুটি বিভিন্ন ইতিহাসবিদ রচিত বিক্রমপুরের গ্রাম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ইতিহাস তন্নতন্ন করে খুঁজে লেখা। এই অঞ্চল নিয়ে এত তথ্যের সমারোহ আমি আর কারও লেখায় পাইনি। পুস্তিকা দুটি এক কথায় অনন্য। চমৎকার সাধু ভাষায় রচিত। এ ছাড়া আরও অনেকেই বিক্রমপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থ রচনা করেছেন।
কত মনীষী জন্মগ্রহণ করেছেন বিক্রমপুরে! এক হাজার বছর আগে বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর। পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর জন্ম রাঢ়িখাল গ্রামে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জন্ম তেলিরবাগ। সরোজিনী নাইডু— ব্রাহ্মণগাঁওয়ের। আরও কত বড় বড় সাহিত্যিকের জন্ম বিক্রমপুরে। বিখ্যাত পঞ্চকবির এক কবি অতুলপ্রসাদ সেন বৃহত্তর বিক্রমপুরের। জীবনানন্দ দাশের পূর্বপুরুষ গাউপাড়া গ্রামের। সেই গ্রাম এখন পদ্মাগর্ভে। সুবোধ ঘোষের কথা মনে পড়ে। বিক্রমপুরের বহর গ্রামে তাদের আদিবাড়ি। একসময়কার বিপুল জনপ্রিয় লেখক। ‘ভারত প্রেমকথা’ তার বিখ্যাত বই। এই লেখকের বেশ কিছু গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। তার প্রথম গল্প ‘অজান্ত্রিক’ চলচ্চিত্রায়িত করেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। বুদ্ধদেব বসুর বাড়ি মালখানগর গ্রামে। এই গ্রামের কথা তিনি লিখেছেন তার স্মৃতিকথা ‘আমার ছেলেবেলায়’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মাদারীপুরের মানুষ। তার দুখণ্ডে রচিত উপন্যাস ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এ আছে মালখানগরের কথা। রানী চন্দর স্মৃতিকথা ‘আমার মা’র বাপের বাড়ি’তে বিক্রমপুরের উল্লেখ আছে। জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় বিক্রমপুর নিয়ে লিখেছেন, ‘ওপারের ছেলেবেলা’। প্রতিভা বসুর ‘জীবনের জলছবি’ গ্রন্থে আছে হাঁসাড়া গ্রামের কথা। প্রফুল্ল রায়ের নামকরা উপন্যাস ‘কেয়াপাতার নৌকো’র অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে রাজদিয়া গ্রাম। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বেশ কয়েকটি উপন্যাসে বিক্রমপুরের কোনো কোনো গ্রামের নাম পাওয়া যায়। ‘উজান’ উপন্যাসে আছে নশঙ্কর গ্রামের কথা। তাদের আদিবাড়ি বাইনখাড়া গ্রামে। বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী বিক্রমপুরের। মুকুন্দ দাশ, মহাকবি কায়কোবাদ, সৈয়দ এমদাদ আলী, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, সত্যেন সেন, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুন ও রিজিয়া রহমান, বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ বিক্রমপুরের। এসব বিখ্যাতজনের বাইরেও রয়ে গেছেন আরও অনেক অনেক লেখক-কবি। তাদের নাম মনে করতে পারছি না বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
সমরেশ বসুকে বলা হতো বাংলা সাহিত্যের যুবরাজ। বিক্রমপুরের পটভূমিতে তিনি অত্যন্ত হৃদয়ছোঁয়া উপন্যাস লিখেছিলেন, ‘সুচাঁদের স্বদেশযাত্রা’। এই মহান লেখকের জন্ম বিক্রমপুরের রাজানগর গ্রামে। তার বেশ কিছু লেখায় বিক্রমপুরের কথা আছে। সাহিত্যের বাইরে বহুক্ষেত্রের বহু বিখ্যাতজন জন্মগ্রহণ করেছেন এই অঞ্চলে, অথবা তাদের পূর্বপুরুষ বিক্রমপুরের। ভারতীয় ইংরেজি ভাষার জগদ্বিখ্যাত লেখক অমিতাভ ঘোষের আদিবাড়ি বিক্রমপুরে। ঢাকা লিটফেস্টে কথায় কথায় তিনি আমাকে বিক্রমপুরের কথা বলেছিলেন। তাদের গ্রামের নামটি বলতে পারেননি। এই লেখায় আমি শুধু লেখক-কবি-সাহিত্যিকদের কথা বলতে চেয়েছি। অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও কত কত বিখ্যাতজন, যেমন রাজনীতিবিদ, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ব্যবসায়ী, কণ্ঠশিল্পী, বিপ্লবী ও সমাজ সংস্কারকের জন্মস্থান হিসেবে অম্লান হয়ে আছে বিক্রমপুর। হরিআনন্দ বাড়রী ভারত সরকারের বেশ কয়েকটি উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত হিমাচলপ্রদেশের রাজ্যপালের দায়িত্বও পালন করেছেন। তার জন্ম বিক্রমপুরে। ইংরেজিতে লিখেছিলেন তার আত্মকথা ‘ইন সান অ্যান্ড শাওয়ার’। ‘আমার বিক্রমপুর’ নামে এ বইয়ের অনুবাদ হয়েছে। এ এক অপূর্ব আত্মকথা। বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল নিয়ে লেখা হুমায়ুন আজাদের যে বই আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে, সেই বইটির নাম ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’। এত মায়া আর আবেগ জড়ানো স্মৃতিকথা আমি আর পড়েছি বলে মনে পড়ে না। এই বইতে জীবন্ত হয়ে আছে একজন অতি উচ্চমানের লেখকের মায়ার চাদরে ঢেকে রাখা ছেলেবেলা। বইটি আমার হাতের কাছে রাখা। সময় পেলেই কয়েক পাতা পাড়ি আর মুগ্ধ হই। নিজের ফেলে আসা বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে বারবার ফিরে যাই। বিক্রমপুরের পথে-প্রান্তরে, ঝোপঝাড় আর মাঠের ধারে, বাড়ির আঙিনা আর পুকুরপাড়ে কত সুগন্ধি ফুল ফুটে থাকত। বহুদূর শৈশব অতিক্রম করে সেসব ফুলের গন্ধ এখনো আমার নাকে এসে লাগে।




