পাঠকের ভয়
কে আসে রাতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বেশ অনেক বছর আগের কথা। নাটোর জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়েছি; আমার এক কাজিনের শ্বশুরবাড়ি। বিশাল পুরনো একটি বনেদি বাড়ি। নিচতলায় সারি সারি ঘর আর দোতলায় মাত্র দুটি কক্ষ। রান্নাঘর, কলঘর, বাথরুম— সবই ছিল মূল ভবনের বাইরে, পুরনো দিনের নিয়মে।
বাড়ির পেছনেই প্রায় এক একর জুড়ে আমবাগান। সেই বাগান পেরোলেই একটি সরু নদীর মতো জলধারা। তার ওপারেই হিন্দুদের শ্মশানঘাট। প্রথম দিনেই লিটন নামে স্থানীয় একজন বাড়ি নিয়ে অদ্ভুত এক কাহিনি বললেন, ‘আম পাড়ার মৌসুমে কয়েকজন মহিলা শ্রমিক কাজ করছিলেন। তাদের একজন বাথরুমে যেতে চাইলে বাড়ির একজন তাকে বাগানের ভেতরের পুরনো পরিত্যক্ত টয়লেটটি দেখিয়ে দিতে যান। দরজা খুলতেই দুজনের চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে আসে লাল শাড়ি পরা, ঘোমটা টানা এক লম্বা নারী। মুখ দেখা যায়নি। শুধু শাড়ি ধরে রাখা হাতটা দেখা গিয়েছিল— কুঁচকে যাওয়া, অস্বাভাবিক কালো চামড়া। দুজন একসঙ্গে চিৎকার করে উঠেছিলেন। তারপরই সেই নারী যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়।’
ঠিক সেই সময়... আমার খাটের নিচ থেকে ভেসে এলো এক ভয়ংকর শব্দ। করমড়... কড়মড়... কড়মড়...যেন কেউ খুব আরাম করে মাংস-লাগা হাড় চিবিয়ে খাচ্ছে
তখন কাজিনের শ্বশুর ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। বাড়িতে ছিল শুধু আমার ভাবি আর তার ছোট বোন। আমার থাকার ব্যবস্থা হলো নিচতলায়, একা। শোবার আগে ভাবি শুধু একটি কথাই বললেন, ‘রাতের বেলা কেউ ডাকলে দরজা খুলবেন না, যতক্ষণ না তিনবার পরিচয় দেয়।’
কথাটা শুনে মনে একটু অস্বস্তি হলো। তাই রাতের খাবার শেষে ইচ্ছা করেই পানি কম খেলাম। যেন মাঝরাতে বাথরুমে যেতে না হয়। ঘড়িতে ১০টা বাজতেই দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। আমার ঘরের একটি জানালা উঠানের দিকে, আরেকটি আমবাগানের দিকে। পেছনের আমবাগানের দিকের জানালাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ। মোটা কাঠের কপাটে আটকানো। কারণটা না জানায় মনে একটা খচখচ ছিল।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, মনে নেই। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। কী কারণে, বুঝতে পারলাম না। ঠিক তখনই বিদ্যুৎও চলে গেল। ভাগ্য ভালো, পাশে রাখা চার্জার লাইটটি নিজে থেকেই জ্বলে উঠল। নিস্তব্ধতার মাঝেই আচমকা উঠান থেকে ভেসে এলো, ধুপ... ধুপ... ধুপ...। মনে হলো কয়েকজন মানুষ দৌড়ে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাচ্ছে। তারপর আবার। আরও জোরে। একসঙ্গে যেন অনেক ছোট ছোট পায়ের শব্দ। কিছুক্ষণ পর সামনের জানালায় খট... খট... খট...।
মনে হচ্ছিল, কেউ জানালার কপাটে হাত রেখে নাড়ছে।
এভাবে কতক্ষণ কেটেছে, জানি না। হঠাৎ চার্জার লাইটের আলোও ম্লান হয়ে এলো।
ঠিক সেই সময়... আমার খাটের নিচ থেকে ভেসে এলো এক ভয়ংকর শব্দ। কড়মড়... কড়মড়... কড়মড়...
যেন কেউ খুব আরাম করে মাংস-লাগা হাড় চিবিয়ে খাচ্ছে। শব্দটা এত স্পষ্ট ছিল যে আমার শরীর মুহূর্তেই জমে গেল।
আর এক সেকেন্ডও সেখানে থাকিনি। চার্জার লাইট হাতে নিয়ে এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ড্রয়িংরুমে চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে আরেকটি বিষয় চোখে পড়ল। ড্রয়িংরুমের পেছনের জানালাটি, যেটি আমবাগানের দিকে, মোটা কাঠের তক্তা দিয়ে পেরেক মেরে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
এতগুলো জানালা কেন বন্ধ?
আমি ঘণ্টাখানেক চুপচাপ বসে ছিলাম। বাইরে তখনো মাঝেমধ্যে সেই দৌড়ানোর শব্দ।
তারপর... দূরে কোনো এক মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে এলো। সঙ্গে সঙ্গেই যেন সবকিছু বদলে গেল। প্রথমে দৌড়ানোর শব্দ থেমে গেল। তারপর ঝিঁঝি পোকার ডাক ফিরে এলো। এর কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎও চলে এলো।
পরের ৯ দিনও ওই বাড়িতে ছিলাম। প্রথম রাতের মতো ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আর হয়নি। তবে আরও দু-এক রাত উঠানে ছোটাছুটির শব্দ শুনেছিলাম। পরে আমার কাজিনের শালা এসে আমার সঙ্গে একই ঘরে থাকলেন। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি থাকার পর আর কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি।




