অ্যালিবাই

আঁকা : অনন্যা বিশ্বাস
সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের পুরনো বারান্দায় বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন গোয়েন্দা রবিন হাসান। তার সামনে বসে থাকা রাশেদ করিমকে আজ অস্বাভাবিক উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে।
‘রবিন ভাই, চাচাকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।’
‘কেন?’
‘কয়েক সপ্তাহ ধরে কেমন যেন বদলে গেছেন। সব সময় বলেন, কেউ তাকে বিষ খাইয়ে মারবে। রাতে ঠিকমতো ঘুমান না। চেহারায় কালি পড়ে গিয়েছে। আমার ভালো লাগছে না। কেমন দমবন্ধ হয়ে আসছে। শিল্পকলা একাডেমিতে নাটক দেখতে যাব। আপনি যদি সময় করে একটু চাচার সঙ্গে বসতেন...।’
রবিন একটু চিন্তা করে বললেন, ‘এক ঘণ্টা পর যাচ্ছি।’
রাশেদের মুখে যেন স্বস্তি ফিরে এলো। কথায় সেটি স্পষ্ট, ‘ধন্যবাদ। আমি তাহলে নিশ্চিন্তে নাটকটা দেখে আসতে পারব।’
কিছুক্ষণ পর বিদায় নিয়ে চলে গেলেন রাশেদ।
প্রায় এক ঘণ্টা পর পুরান ঢাকার সরু গলি পেরিয়ে পৌঁছালেন রবিন হাসান।
বাড়িটি যেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা কিছু। উঁচু লোহার ফটক, মোটা দেয়ালে শেওলার আস্তরণ, মাঝখানে বিশাল পাথর বাঁধানো উঠান। চারপাশে খিলানওয়ালা বারান্দা। পুরনো দরজা, রঙচটা জানালা আর ছাদের মাঝখানে ঝুলে থাকা ধুলোমাখা ঝাড়বাতি। দেয়ালে সারি সারি বিবর্ণ প্রতিকৃতি। মনে হচ্ছিল, ছবির মানুষগুলো এখনো নিঃশব্দে সবকিছু দেখছে। বাতাসে পুরনো কাঠ, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল আর দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গতার গন্ধ।
এই বাড়ির মালিক জহিরুল করিম। বয়স প্রায় সত্তর। বিপুল সম্পদের মালিক। স্ত্রী-সন্তান কেউ নেই। একমাত্র উত্তরাধিকারী ভাতিজা রাশেদ। রবিন হাসানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই রাশেদ। সেই সূত্রে জহিরুল করিমের সঙ্গেও কিছুটা পরিচয় আছে।
ফটক পেরোতেই বৃদ্ধ ভৃত্য কাদের মিয়া প্রায় দৌড়ে এলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কোনো একটা গড়বড় আছে।
‘স্যার, বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে!’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সে।
‘কী হয়েছে?’
‘সাহেব কফি খেয়ে লাইব্রেরিতে ঢুকে দরজা বন্ধ করেছেন। প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। অনেক ডাকাডাকি করেছি। কোনো সাড়া নেই।’
রবিন দ্রুত লাইব্রেরির সামনে এলেন। পুরনো দিনের কাঠের দরজা সত্যিই ভেতর থেকে বন্ধ।
তিনি কয়েকবার ডাকলেন।
‘মিস্টার করিম! শুনতে পাচ্ছেন?’
কোনো উত্তর নেই।
এবার দরজায় ধাক্কা দিলেন। কোনো সাড়া নেই। দুজন মিলে বেশ কয়েকবার ধাক্কা দিয়েও কাজ হলো না।
‘ভাঙতে হবে, উপায় নেই। বাড়ির আর যারা আছে, ডাকুন।’
অন্য ভৃত্যরা এলে সম্মিলিত চেষ্টায় ভাঙল দরজা।
ঘরে ঢুকেই কাদের মিয়া আর্তনাদ করে উঠল।
মেঝেতে পড়ে আছেন জহিরুল করিম। চোখ স্থির। শরীর নিথর। ডান হাতের কাছে একটি ছোট কাচের শিশি।
রবিন তুলে দেখলেন। লেবেলে লেখা— স্ট্রিকনিন। শিশিটি সম্পূর্ণ খালি।
টেবিলে অর্ধেক খাওয়া কফির কাপ। একটি বই খোলা। চশমা পাশে রাখা।
ঘরের অন্য পাশে কাচঘেরা বারান্দার দরজা আধখোলা। রাতের ঠান্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকছে।
রবিন ধীরে ধীরে পুরো ঘর ঘুরে দেখলেন। জানালার ধুলো অক্ষত। বারান্দায় পায়ের ছাপ নেই। ঘরে কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্নও নেই।
তিনি নিচু হয়ে মৃতদেহের পাশে বসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন, ‘কেউ কিছু স্পর্শ করবেন না। পুলিশে খবর দিন।’
প্রায় আধা ঘণ্টা পর পুলিশ এসে পৌঁছাল। সাব-ইন্সপেক্টর মাহবুব রবিনকে দেখে বললেন, ‘আপনি আছেন, ভালো হলো। কী মনে হচ্ছে?’
ফটক পেরোতেই বৃদ্ধ ভৃত্য কাদের মিয়া প্রায় দৌড়ে এলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কোনো একটা গড়বড় আছে
রবিন শান্তভাবে বললেন, ‘প্রথমে সবাইকে এক ঘরে আনুন। তারপর কথা বলি।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত হলো কাদের মিয়া, বাড়ির রাঁধুনি রহিমা, মালী সালাম।
ঠিক তখনই নাটক দেখে ফিরে এলেন রাশেদ করিম।
রাশেদ হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকেই বললেন, ‘চাচা কোথায়?’
কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই তার চোখ মৃতদেহের দিকে চলে গেল।
স্তব্ধ হয়ে গেছেন যেন রাশেদ। ‘না... এটি হতে পারে না!’
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন তারপর।
ইন্সপেক্টর মাহবুব সংক্ষেপে ঘটনা জানালেন।
সব শুনে রাশেদ বিড়বিড় করে বললেন, ‘কিন্তু... লাইব্রেরির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল কেন?’
রবিন একবার তার দিকে তাকালেন। তারপর অন্যদের জিজ্ঞেস করতে লাগলেন— কে কোথায় ছিল, কে কফি বানিয়েছিল, কে শেষবার জহিরুল করিমকে দেখেছে।
সবার বক্তব্য প্রায় একই। কফি বানিয়েছিলেন রহিমা। কাদের মিয়া ট্রেতে করে কফি পৌঁছে দেন।
জহিরুল করিম কফি নিয়ে লাইব্রেরিতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর আর কেউ তাকে দেখেনি।
পুলিশ পুরো বাড়ি তল্লাশি করেও তেমন কিছু পেল না।
ইন্সপেক্টর মাহবুব বললেন, ‘মনে হচ্ছে আত্মহত্যা। স্ট্রিকনিনের শিশি পাশে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বাইরে থেকে কেউ ঢোকেনি।’
রবিন ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন, ‘না। এটা আত্মহত্যা নয়।’
সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
তাহলে?
রবিন বললেন, ‘খুনি এই ঘরেই দাঁড়িয়ে আছে।’
রাশেদ বিস্ময়ে হতবাক, ‘কী বলছেন রবিন ভাই।’
ইন্সপেক্টর মাহবুব জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কাছে প্রমাণ আছে?’
রবিন মৃদু হাসলেন, ‘আছে। তবে প্রমাণটা খুব ছোট।’
পাঠক বলুন তো, এটা হত্যা কীভাবে বুঝলেন রবিন? হত্যাকারী কে?
(বিদেশি কাহিনি অবলম্বনে)
উত্তর পাঠাতে হবে ৮ জুলাইয়ের মধ্যে। সঠিক উত্তরদাতাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একজন পাবেন ১০০০ টাকার বই।




