মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের হারের পরও অনিশ্চয়তায় ইরানিরা

তেহরানের রাস্তায় ট্রাম্প,নেতানিয়াহু, ভ্যান্স ও উইটকফের ছবি সম্বলিত একটি ব্যানারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী— রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের ফল প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরানের এনঘেলাব স্কয়ারে জড়ো হন ইরান সরকারের সমর্থকেরা। সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবিসংবলিত একটি বিশাল ব্যানারে আগুন ধরিয়ে দেন তারা।
এরপর রিপাবলিকানদের পরাজয় উদ্যাপন করে একের পর এক কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন ইরানি কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, এই ফলাফল ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধের প্রতি মার্কিন জনগণের প্রত্যাখ্যানেরই প্রতিফলন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পতনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে।’ তার বাবা ও পূর্বসূরি আলী খামেনি গত ফেব্রুয়ারিতে হামলায় নিহত হন।
আরেকটি আয়োজনে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তেহরানের তাজরিশ স্কয়ারে ট্রাম্পের প্রতীকী ফাঁসির দৃশ্য সম্প্রচার করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মুখোশ ও কমলা রঙের কারাবন্দির পোশাক পরা এক অভিনেতাকে দেখা যায়।
তবে দেশের ভেতরে কিছু ইরানি নাগরিকের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের মতে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিপর্যয় তাদের ভবিষ্যতের জন্য কী অর্থ বহন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তেহরানভিত্তিক সাংবাদিক মেহনাজের মতে, মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা। সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা বুঝে উঠতে পারছেন না তারা।
তিনি বললেন, ‘আমি সত্যিই ভীত। কী নিয়ে? এখনো জানি না। অনুভূতিটা অদ্ভুত। সত্যি বলতে, এখানকার পরিস্থিতি একেবারেই অস্বাভাবিক। মানুষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে তাকিয়ে আছে পরিবর্তনের আশায়। বিষয়টি আমার কাছে খুব অদ্ভুত লেগেছিল, এখনো লাগে।’
মেহনাজের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজনের ধারণা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়াতে পারে।
তার ভাষ্য, ‘অনেকে মনে করেন, এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ এবং তকে আর পুনর্নির্বাচিত হওয়ার চিন্তা করতে হচ্ছে না। তাই তিনি হয়তো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন। তবে আমার উদ্বেগের বিষয় হলো, ইরানি শাসকগোষ্ঠী প্রতিদিন মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে। যুদ্ধ থাকুক বা না থাকুক, পরিস্থিতি কেবল খারাপ হচ্ছে।’
অসলোভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসের (আইএইচআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ইরানি কর্তৃপক্ষ অন্তত ৬৯৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে।
তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী লেখক আলবোরজ বলেন, স্বাভাবিক জীবনের দৃশ্যের আড়ালে ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে বাস্তব পরিস্থিতি।
তার মতে, ‘দোকানগুলোতে আগের মতোই মানুষকে পোশাক ও অন্যান্য পণ্য ঘেঁটে দেখতে দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কেনাকাটা এখন খুব কম হচ্ছে। একটি টি-শার্টের দাম এখন এক বছর আগে পুরো স্যুট কিনতে যে অর্থ লাগত, তার সমান।’
তিনি বললেন, ‘দৈনন্দিন হাসিঠাট্টা ও কথাবার্তার মধ্যেও পথচারীদের আলোচনা কানে আসে—কেরোসিনের হিটার ভালো, নাকি কাঠ পোড়ানো চুলা। অবকাঠামো কোনো দিন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।’
আলবোরজ বললেন, ‘এটি বাধ্য হয়ে টিকে থাকার একধরনের মানসিকতা। এর মধ্যে মহৎ কিছু নেই।’
ট্রাম্পের পরাজয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। তবে আলবোরজ বলেন, তার আশপাশের মানুষের মধ্যে বরং পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে—এমন ধারণাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে যা ঘটেছে এবং ইসরায়েলের পরিস্থিতি বিবেচনায় সাধারণভাবে মানুষের মনে হচ্ছে, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কমেছে। তবে কেউই নিশ্চিত নন।’
সরকারবিরোধী ইরানিদের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে মতভেদ থাকলেও সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একটি বিষয়ে অভিন্ন ভয় রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রে যা-ই ঘটুক না কেন, ইরানের অভ্যন্তরে দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকবে।
কারাজের ২৪ বছর বয়সী বাসিন্দা নূর জানুয়ারিতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর তিন সপ্তাহ কারাগারে ছিলেন। তার আশঙ্কা, পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
তিনি বললেন, ‘যুদ্ধের সময় তারা আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাদের দমন-পীড়নের ব্যবস্থা এখন এমন একটি যন্ত্রের মতো, যা নিখুঁতভাবে চলছে। আকাশ মেঘে ঢাকা থাকুক কিংবা বোমা পড়ুক—এটি থামবে না।’
ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর সামনের দিনগুলো নিয়ে তার অনুভূতি জানতে চাইলে নূর বলেন, অনিশ্চয়তা এখন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
তার মতে, ‘দেশের ভেতরে কেউ যদি আপনাকে বলে, এরপর কী ঘটবে সে বিষয়ে তার পূর্বাভাস আছে, তাহলে সে মিথ্যা বলছে। কেউই, একেবারেই কেউ জানে না কী ঘটতে যাচ্ছে। সারা বছর আমরা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি।’
নূর বললেন, ‘তবে কী ঘটবে না, তা আমি জানি। এই দমন-পীড়ন শেষ হবে না।’
মধ্য ইরানের একজন চিকিৎসাকর্মী মোয়েইনের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শক্তি, বিশেষ করে সদস্যদের আনুগত্য ও কৌশলগত সক্ষমতা কম করে দেখেছে।
তিনি বললেন, ‘আইআরজিসি কতটা শক্তিশালী এবং কৌশলগতভাবে কতটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তা আমিও কম করে দেখেছিলাম। আগে মনে করতাম, কিংবা অন্তত এমনটাই ভাবতে পছন্দ করতাম যে পুরো ব্যবস্থাটি মূলত জরাজীর্ণ মোল্লা ও দুর্নীতিগ্রস্ত, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এখন আমার কাছে স্পষ্ট, তারা কিছুটা হলেও দক্ষ। আর দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তারা এখনো অনুগত।’
মোয়েইনের কাছে এই উপলব্ধি এক তিক্ত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। তিনি বলছিলেন, ‘এমন একটি রাষ্ট্র, যারা কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা সহ্য করতে পারে এবং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর মোকাবিলা করতে পারে, অথচ নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের যন্ত্র ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না।’
তিনি আরও বললেন, ‘সত্যিই লজ্জার বিষয়। বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং অর্ধশতাব্দী ধরে নিষেধাজ্ঞা সহ্য করে টিকে থাকার পর রাস্তায় তরুণীদের হত্যা করা।’
ইরানে চলমান দমন-পীড়নের বিষয়ে বিশ্বনেতারা প্রতিক্রিয়া জানাবেন কি না, জানতে চাইলে মোয়েইন বলেন, ইউরোপীয় নেতাদের ওপর তার প্রত্যাশা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
মেহনাজের মতে, সরকারপন্থীদের উদ্যাপন প্রতিদিন আরও ‘আপত্তিকর’ হয়ে উঠছে।
তার ভাষ্য, ‘তারা উদ্যাপন করবে না-ই বা কেন? তারা [আইআরজিসি] তো সবে টিকে থাকার নতুন আশা খুঁজে পেয়েছে।’








