জাহাজে বেতন ১৫ লাখ, মেরিনে লাখের নিচে, মিলছে না শিক্ষক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সমুদ্রে জাহাজের চাকরিতে মাসে আয় ১৫ লাখ টাকার ওপরে। অথচ ডাঙায় মেরিন একাডেমিতে শিক্ষকতা করলে বেতন জোটে ১ লাখ টাকারও কম! আকাশ-পাতাল এই ব্যবধানের কারণেই দেশের প্রথম সারির মেরিটাইম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে শিক্ষক মিলছে না। বারবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না যোগ্য শিক্ষক। আর অভিজ্ঞ শিক্ষকরাও একে একে একাডেমি ছেড়েছেন। এতে মান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বেকারে ভরপুর এই দেশে একটি সাধারণ চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে লাখো তরুণের ভিড় জমে। অথচ মেরিন একাডেমির চিত্রটা ঠিক উল্টো। এর প্রধান কারণ, সাধারণ কোনো ডিগ্রিতে এই একাডেমির শিক্ষক হওয়া যায় না। এখানে পড়াতে হলে মাস্টার মেরিনার বা চিফ ইঞ্জিনিয়ারের মতো প্রফেশনাল ডিগ্রি লাগে, দরকার হয় সমুদ্রগামী জাহাজে কাজের অভিজ্ঞতা। যারা এই ডিগ্রি অর্জন করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের ব্যাপক চাহিদা। ডলারে বেতন পান তারা। তাই উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ এই মেরিনাররা ছাড়ছেন মেরিন একাডেমির চাকরি। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানালেন, একজন মেরিন ক্যাডেটের পড়ালেখার পেছনে সরকার তিন বছরে কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে। চাকরির শুরুতেই তাদের মাসিক বেতন হয় ৫ লাখ টাকার বেশি।
এই ক্যাডেট তৈরির শিক্ষকদের পেছনে বিনিয়োগ করতে সরকারের এত উদাসীনতা কেন?
আনাম চৌধুরীর শঙ্কা, দ্রুত এই শিক্ষক সংকটের সমাধান না হলে চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমি বড় ঝুঁকিতে পড়বে। প্রথমত, শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে নিচে নেমে যাবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) ‘হোয়াইটলিস্ট’ বা বৈশ্বিক স্বীকৃতি থেকে বাদ পড়ার শঙ্কা তৈরি হবে।
তিনি জানালেন, ২০১২ সালে ফিলিপাইন এমন বিপদে পড়েছিল। কাটিয়ে উঠতে তাদের ৯ বছর লেগেছিল। আর হোয়াইটলিস্ট থেকে বাদ পড়লে এই একাডেমি থেকে পাস করা ক্যাডেটদের কোনো বিদেশি জাহাজে চাকরির সুযোগ থাকবে না।
চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমির জনবল কাঠামোয় শুধু প্রফেশনাল শিক্ষক পদ আছে ২০টি। বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র অর্ধেক। শূন্য পদে বারবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ ২০২৩ সালের বিজ্ঞপ্তিতেও কোনো সাড়া মেলেনি। হাতেগোনা যে কয়েকজন আছেন, তাদের ওপরই সব ক্লাসের চাপ পড়ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে ক্যাডেটদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ।
মেরিন একাডেমি অ্যালামনাই সদস্যরা বলছেন, সামনে আইএমও অডিট টিম আসার আগে যদি শিক্ষক সংকটের সুরাহা না হয়, তাহলে বড় বিপদে পড়বে বাংলাদেশ।
শিক্ষক না পাওয়ার মূল কারণ একেবারেই সরল। একজন মাস্টার মেরিনার বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার যখন কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে চাকরি করেন, তার মাসিক বেতন ১৫ লাখ টাকার বেশি (১২ থেকে ১৫ হাজার ডলার)। অথচ মেরিন একাডেমিতে যোগ দিলে সরকারি স্কেলে তার বেতন লাখ টাকার অনেক নিচে। মাসে ১৫ লাখ টাকার সমুদ্রে জাহাজের বিলাসবহুল চাকরি ছেড়ে দেশের একাডেমিতে পড়াতে আসতে চান না মেরিনাররা।
এমনিতেই নতুনরা আসছেন না, তার ওপর যারা আগে যোগ দিয়েছিলেন, তারাও টিকছেন না। একটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০০২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ জন অভিজ্ঞ শিক্ষক একাডেমি ছেড়ে চলে গেছেন। বিশাল বেতন নিয়ে তারা হয় আবার জাহাজে ফিরে গেছেন, নয়তো বিদেশি নামিদামি প্রতিষ্ঠানে বিপুল বেতনে যোগ দিয়েছেন।
তাদের একজন ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শামসুল মান্নান। যিনি ২০২২ সালে টিউটর হিসেবে চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে চাকরি শুরু করেছিলেন। এক বছর চাকরির পর কাঙ্ক্ষিত বেতন-ভাতা না পেয়ে চাকরি ছেড়ে লন্ডন চলে যান। তিনি জানালেন, চট্টগ্রামের ছেলে হিসেবে শিক্ষকতায় থাকতে চেয়েছিলাম। নির্ধারিত বেতন-ভাতা না পেয়ে এক বছর নিজের সঞ্চয় ভেঙে শিক্ষকতা করেছি। আশাহত হয়ে দেশ ছেড়েছি। আবেগ দিয়ে তো পেট চলে না। এখন লন্ডনের ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির ফ্লিটউড নটিক্যাল কলেজে সিনিয়র টিউটর হিসেবে শিক্ষকতা করছি। শুধু বেতন মাসে ৪ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা)। এর বাইরে অন্য সুযোগ-সুবিধা। থাকছি পরিবারসহ।
তাহলে প্রশ্ন— ২০০২ সালের আগপর্যন্ত শিক্ষকরা কীভাবে কাজ করতেন? তখন একাডেমির শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা বা আকর্ষণীয় ‘মেরিন অ্যালাউন্স’ চালু ছিল। ব্রিটিশ বা আইএমওর বিভিন্ন প্রজেক্টের অধীনে তারা আন্তর্জাতিক স্কেলে বা তার কাছাকাছি সম্মানজনক বেতন পেতেন। বেতনের পাশাপাশি তাদের সামাজিক মর্যাদা ও অন্যান্য সুবিধা এতই চমৎকার ছিল যে, জাহাজের বেতনের কিছুটা কম হলেও অভিজ্ঞ মেরিনাররা হাসিমুখেই শিক্ষকতা পেশায় আসতেন। কিন্তু জটিলতা শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস এক চিঠির মাধ্যমে এই বিশেষ ভাতা দেওয়া বন্ধ করে দিলে সংকট শুরু হয়। একে একে শিক্ষকরা একাডেমি ছাড়তে থাকেন। মেরিন একাডেমি ও অ্যালামনাইরা অনেক চেষ্টা করেও বিশেষ ভাতা আর চালু করতে পারেননি। এরপর প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। সেই মামলা এখনো ঝুলে আছে।
মেরিন একাডেমির কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীম বললেন, ‘ইনস্ট্রাকটর নিয়োগের একাধিক বোর্ডে আমি দেখেছি, চার পদের বিপরীতে মাত্র একজন ইন্টারভিউ দিয়েছেন। সেই একমাত্র প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করলেও বেতন কাঠামো বাড়ার আশা না পেয়ে যোগ দেননি। এভাবে চলতে থাকলে তো একাডেমির আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখা যাবে না। সবাই মিলে বিপদে পড়ব।’
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার (আইএমও) বাধ্যবাধকতা এবং দেশীয় আইন অনুযায়ী মেরিন ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ শুধু দক্ষ ও সনদপ্রাপ্ত মেরিন পেশাদারদের দ্বারাই পরিচালনা করা আবশ্যক। আইএমও নিয়মিতভাবে একাডেমিগুলোর মান নিরীক্ষা করে থাকে। ফলে যোগ্য শিক্ষক না থাকলে একাডেমি ও মেরিনাররা ঝুঁকিতে পড়বেন। মেরিন একাডেমির শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষ বেতন কাঠামো (স্পেশাল পে স্কেল) তৈরির পরামর্শ মেরিনারদের।



