মনিরুলের ‘মানবতার দুয়ার’

মানবতার দুয়ার সংগঠন থেকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়
ভোলায় গড়ে উঠেছে এক অসাধারণ মানবিক উদ্যোগ— বেস্ট ইনিশিয়েটিভ ফর ভোলা অ্যাডভান্সমেন্টের (বিবা) ‘মানবতার দুয়ার’। নতুন নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এই দুয়ার যেন মানবতার এক বিস্তৃত ছায়ায় পরিণত হচ্ছে।
ভোলা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের যুগীরঘোল এলাকায় বিবার আয়োজনে পরিচালিত মানবতার দুয়ার এখন অসহায় মানুষের আশার প্রতীক। এই সংগঠনটি নতুন-পুরাতন পোশাকের উন্মুক্ত বিতরণ ব্যবস্থার আয়োজন করছে— যার প্রয়োজন তিনি নিয়ে যান, যার আছে তিনি রেখে যান পোশাক।
প্রতিষ্ঠানটি কিছু অসহায় মানুষকে দোকান ও ব্যবসার উপকরণ দিয়ে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। প্রতি শুক্রবার মানবতার দুয়ারের মাধ্যমে ১০০টিরও বেশি অসহায় পরিবার পায় বিনামূল্যে সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।
এই মহৎ উদ্যোগের সূচনায় ছিলেন মো. মনিরুল ইসলাম। নিজের সীমিত সামর্থ্য নিয়েই তিনি শুরু করেছিলেন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজ। পরে তা রূপ নেয় একটি সম্মিলিত মানবিক প্রয়াসে।
মনিরুল ইসলাম ১৯৭৫ সালে ভোলায় জন্ম নেন। পেশায় একজন শিক্ষক ও ব্যবসায়ী। তিনি মাস্টার্স পাস করে সদর উপজেলার আব্দুর রব মাধ্যমিক বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করছেন। পাশাপাশি ভোলা সদর রোডে বিয়েসামগ্রীর একটি দোকানের স্বত্বাধিকারী। এ ছাড়া স্কাউটের বরিশাল অঞ্চলের উপকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ভোলা শহরের যুগীরঘোল এলাকায় দুই ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস তার।
২০০৫ সালে ভোলা সদর উপজেলার জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিয়ে শুরু হয় তার কার্যক্রম। ২০১৮ সালে বিবা প্রতিষ্ঠা করেন। করোনাকালে হাত ধোয়া কর্মসূচি, খাদ্য সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। এরপর এই সংগঠন থেকে রমজানে জায়নামাজ, বর্ষায় ছাতা, শীতে কম্বল ও স্যান্ডেল বিতরণ, শিক্ষার্থীদের পোশাক প্রদান, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার জন্য মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করেন তিনি। এ ছাড়া নারীদের কোরআন শিক্ষা ও পথচারীদের জন্য বিশুদ্ধ পানিরও ব্যবস্থা করছেন।
মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘প্রতি শুক্রবার এলেই ভাবি— কী দেব, কীভাবে দেব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে ব্যবস্থা হয়ে যায়। আমি চাই মানুষের মুখে হাসি ফুটুক, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মানুষের জন্য কাজ করার যে তৃপ্তি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
তিনি যোগ করেন, প্রথমে নিজ অর্থায়নে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে এই উদ্যোগে অর্থ দিয়ে যুক্ত হয়েছেন জেলা প্রশাসনসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ।
সদর উপজেলার রতনপুর এলাকার ফাতেমা ও চরজংলার নায়মুনা জানালেন, প্রতি শুক্রবার মানবতার দুয়ার থেকে তারা কিছু না কিছু সাহায্য পান। এখানে তাদের মতো বহু অসহায় মানুষ সাহায্য নিতে আসেন।
ভোলা থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক তালহা তালুকদার বাঁধন বলেছেন, ‘বিবার মানবতার দুয়ার শুধু সহায়তাই দিচ্ছে না, মানুষের মনমানসিকতা পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখছে।’
ভোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইশতিয়াক আহমেদের ভাষায়, ‘এটি একটি জীবন্ত শিক্ষা। মনিরুল ইসলামের উদ্যোগ প্রমাণ করে, মানুষ মানুষের জন্য।’
ভোলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন লিটন বলেছেন, স্বচ্ছতার সঙ্গে মানবতার দুয়ারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে আশা করেন তিনি।
ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সজল কুমার দাস বললেন, এ ধরনের উদ্যোগ সমাজের জন্য ইতিবাচক ও অনুকরণীয়। প্রশাসন সবসময় মানবিক কাজকে উৎসাহিত করে। বিত্তবানরা এগিয়ে এলে আরও বেশি অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব।



