কুমিল্লা
পুলিশ গিয়েছিল, যাননি ইউএনও; ‘গার্ড অব অনার’ ছাড়াই হলো বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন
- সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না- অজুহাত ইউএনওর
- উপস্থিত হয়েছিল পুলিশের সঙ্গে বিউগলের সুর বাজানোর দলও

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার।ছবি: আগামীর সময়
আব্দুস সাত্তার (৭৮)। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে করেছেন লড়াই। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতার লাল-সবুজের পতাকা। অথচ জীবনের শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মানটুকুও জুটল না এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ভাগ্যে।
একপর্যায়ে ‘গার্ড অব অনার’ ছাড়াই তাকে দাফন করতে বাধ্য হয়েছেন স্বজনেরা। এ ঘটনায় কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবারের সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা ও সহযোদ্ধারা।
গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার। তিনি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহালক্ষ্মীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। কর্মজীবনে যোগাযোগ ও আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। বার্ধক্যের শেষ দিনগুলো ছেলের সঙ্গে ঢাকায় কাটাচ্ছিলেন তিনি।
মৃত্যুর পর ঢাকায় প্রথম জানাজা শেষে বৃহস্পতিবার বিকালে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে রাষ্ট্রীয় সম্মানের অংশ হিসেবে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার অপেক্ষায় থাকেন স্বজনেরা। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও উপজেলা প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত হননি। একপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ছাড়াই তাকে দাফন করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্না ইসলামকে একাধিকবার জানানো হলেও তিনি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেননি। রাত হয়ে যাওয়ার অজুহাতে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়নি বলে দাবি স্বজনদের।
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান প্রদর্শন নিয়ে কী আছে আইনে
বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শন আদেশ, ২০২০ অনুযায়ী, মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার কফিন জাতীয় পতাকা দ্বারা আবৃত করতে হবে। তবে, সৎকার বা সমাধিস্থ করার পূর্বে জাতীয় পতাকা খুলে ফেলতে হবে। সরকারের অনুমোদিত প্রতিনিধি কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। অনুমোদিতসংখ্যক পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সশস্ত্র সালাম প্রদান করতে হবে এবং বিউগলে করুণ সুর বাজাতে হবে।
এতে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গার্ড অব অনার পরিচালনা করবেন। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় বা জনগুরুত্বপূর্ণ কাজের কারণে থাকতে না পারলে থানার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে ওই বাহিনীর নিজস্ব রীতি অনুসরণ করতে হবে।
আদেশে আরও বলা হয়েছে, বীর মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী এবং ধর্মীয় নীতি অনুযায়ী সৎকার বা সমাধিস্থ করতে হবে। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
‘দেশকে স্বাধীন করেও প্রাপ্য সম্মানটুকুও পেল না’
ভাইকে শেষ সম্মানটুকু দিতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন আব্দুস সাত্তারের ভাই শাহজাহান। তিনি বলেন, ‘চেয়েছিলাম ভাইকে শেষ সম্মানটুকু জানিয়ে চিরবিদায় দিতে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। ৯ মাস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন করল, অথচ সে তার প্রাপ্য সম্মানটুকুও পেল না।’
স্থানীয় মহালক্ষ্মীপাড়া গ্রামের আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মোল্লা বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া না গেলেও অন্তত প্রশাসনের লোক এসে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তা-ও করা হয়নি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সহযোদ্ধার এমন অমর্যাদা সহ্য করার মতো নয়।’
এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ করেন ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া মাস্টার। তিনি বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে ‘গার্ড অব অনার’ ও সশস্ত্র সালামের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ইউএনও মুন্নী ইসলাম এতে সাড়া দেননি।’
‘সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না বলে অজুহাত দেখিয়েছেন ইউএনও— অভিযোগ করেন তিনি।
জানাজায় অংশ নেওয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল হক বলেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ না দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ‘গাফিলতি’ ছিল না বলে দাবি করেছেন ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, ‘গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য পুলিশ পাঠিয়েছিলাম। পুলিশ লাইন থেকে বিউগলের সুর বাজানোর জন্য দলও এসেছিল। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ উপস্থিত না থাকায় পুলিশ একা গার্ড অব অনার দিতে পারেনি।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুন্নী ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
পরে যোগাযোগ করা হয় কুমিল্লা জেলা প্রশাসক (ডিসি) রোজি আকতারের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বলেন, ‘ওই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে কেন গার্ড অব অনার দেওয়া হয়নি, কেন তার বাড়িতে গিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়নি, এ বিষয়ে লিখিত জবাব চাওয়া হয়েছে ব্রাহ্মণপাড়ার ইউএনওর কাছে। বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকেও।’
লিখিত জবাব পেলে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে-যোগ করেন ডিসি।




