ভাগ্য খুলতে পারে দেড়শ কর্মকর্তার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি হতে যাচ্ছে চলতি মাসেই। যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদের এই পদোন্নতিতে নিয়মিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ২১তম ব্যাচকে। তাদের সঙ্গে পদোন্নতি পেতে পারেন অতীতে বঞ্চিত (লেফট আউট) হওয়া বিভিন্ন ব্যাচের কিছু কর্মকর্তাও। এ ছাড়া পদোন্নতি পাচ্ছেন অন্যান্য ক্যাডার থেকে আসা যুগ্ম সচিবদের অনেকেই। সব মিলিয়ে সাড়ে তিনশ কর্মকর্তার তথ্য-উপাত্ত যাচাই করছে পদোন্নতির জন্য সুপারিশের দায়িত্বে থাকা সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি নভেম্বরের মধ্যেই জারি হতে পারে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন।
শেষমেশ ভাগ্য খুলতে পারে প্রশাসনে কর্মরত দেড়শ যুগ্ম সচিবের— জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আভাস মিলেছে এমনটিই। যদিও বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি।
জানা গেছে, অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির সুপারিশের তালিকা চূড়ান্তে অক্টোবরের শেষদিকে ঘন ঘন বৈঠকে বসেছে এসএসবি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও বৈঠক করেছে তারা। সবশেষ গত ২৪ অক্টোবর ছুটির দিনেও বৈঠক করেন এসএসবি সদস্যরা। চলতি সপ্তাহেও বৈঠক করেছে এসএসবি। প্রথমদিকে বিসিএস ২১ ও ২২তম ব্যাচকে একসঙ্গে পদোন্নতি দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিলেও পরে সেখান থেকে সরে আসে এসএসবি। পরে সিদ্ধান্ত হয়, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়মিতই পদোন্নতি হবে। ফলে এক ব্যাচের সঙ্গে আরেক ব্যাচকে পদোন্নতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৩ সালের ৩১ মে যোগদান করেন বিসিএস ২১তম ব্যাচের ১৯১ জন কর্মকর্তা। পরে এই ব্যাচে ইকোনমিক ক্যাডার থেকে একীভূত হয়ে এসেছেন আরও ১২ জন। তাদের মধ্যে বর্তমানে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন ১৮৪ জন। এ ছাড়া অতীতে বিভিন্ন ব্যাচের বঞ্চিত প্রায় একশ এবং অন্যান্য ক্যাডার থেকে আসা সমসংখ্যক কর্মকর্তাকেও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এসএসবির বৈঠকে তাদের কর্মজীবনের সব নথিপত্র করা হচ্ছে পর্যালোচনা। এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ ২০২২ সালে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। যারা বাকি ছিলেন তারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পদোন্নতি পেয়েছেন। যুগ্ম সচিব হিসেবে দুই বছর চাকরি করলেই অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জিত হয়। সেই হিসাবে এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের অর্জিত হয়েছে অতিরিক্ত সচিব হওয়ার যোগ্যতা। এরই মধ্যে এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের চাকরিজীবনের সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে এসএসবি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দায়িত্ব পালন করেছেন এই ব্যাচের ৩০ জন। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন ১৫ জনের বেশি। তাদের এবার বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না পদোন্নতির তালিকায়।
গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ করতে চান না এসএসবির এমন একাধিক সদস্য জানালেন, সবকিছু ঠিক থাকলে দেড়শর মতো কর্মকর্তা পদোন্নতি পেতে পারেন এ যাত্রায়। এর মধ্যে বিসিএস ২১তম ব্যাচের সঙ্গে অতীতের বঞ্চিত ও অন্যান্য ক্যাডারের ৫০ কর্মকর্তার ভাগ্য খুলতে পারে। তবে যারা শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিভিন্ন জেলার ডিসি এবং মন্ত্রীদের পিএস ছিলেন, তাদের পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে না। এর বাইরেও যাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান, আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং অদক্ষতা ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদেরও পদোন্নতি হচ্ছে না। এমনকি কর্মকর্তাদের অতীত পোস্টিং রেকর্ডও পদোন্নতির সময় পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এদিকে, আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের অনেকে আধা সরকারি পত্র (ডিও) দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের অনেকে ‘ভোল পাল্টে’ জাতীয়তাবাদী সেজে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ভুল বুঝিয়ে ডিও নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। অথচ তদবির বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার। গত সেপ্টেম্বরে সরকারি কর্মচারীদের চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। একই সঙ্গে কোনো কর্মচারীর পক্ষে অন্য ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের করা তদবিরের বিস্তারিত তথ্য ডোসিয়ারে (চাকরি-সংক্রান্ত নথি) সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, “সরকারি কর্মচারীরা কী ধরনের আচরণ করবেন, তা ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর সংশ্লিষ্ট বিধিতে উল্লেখ রয়েছে। সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের কেউ কেউ চাকরি-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তদবির করার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে বিভিন্ন দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পাঠাচ্ছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর বিধি ২০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর ২(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল।”
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বলেছে, কোনো সরকারি কর্মচারী তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের মাধ্যমে চাকরি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির করলে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে অতিরিক্ত সচিবের নিয়মিত পদ আছে ২১২টি। এর সঙ্গে সমপর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরে প্রেষণে (নির্ধারিত পদের বাইরে অন্যান্য দপ্তর বা সংস্থায় নিয়োগ) থাকা পদ আছে আরও ১২৫টির মতো। সব মিলিয়ে অতিরিক্ত সচিবের পদ দাঁড়ায় ৩৩৭টিতে। এ মুহূর্তে প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিবের সংখ্যা সাড়ে তিনশর মতো হবে। ফলে নতুন করে পদোন্নতি হলেও অনেক কর্মকর্তাকে ইনসিটু (আগের পদেই কাজ) করে রাখা হতে পারে। সবশেষ চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি ১২৪ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত সচিব করা হয়েছিল। ওই সময় নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে বিসিএস ২০তম ব্যাচের ১৮৩ কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল।
জানতে চাইলে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া আগামীর সময়কে বললেন, ‘পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের সময়মতো পদোন্নতি দেওয়া উচিত। না হলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। প্রশাসনিক কাজকর্ম বিঘ্নিত হয়। জন্ম হয় হতাশাগ্রস্ত একটি প্রশাসনের। বেলাশেষে জনগণের সেবাই ব্যাহত হয়।’



