এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন

সামান্তা শারমিন—ফাইল ছবি
পদাবনতির পর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছাড়লেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন, নারী প্রশ্নে অবস্থানসহ নানা বিষয়ে মতপার্থক্যের কথা জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ২০২৫ সালের শুরুতে এনসিপির জন্মলগ্ন থেকে দলটিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা দলটি গঠনের আগে যে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করেছিলেন, তার মুখপাত্রের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
সম্প্রতি এনসিপির কমিটি পুনর্গঠনে সামান্তা শারমিনের পদানবতি ঘটে। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব থেকে তাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
তার দুই সপ্তাহ পর আজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এনসিপি ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, পদত্যাগপত্র এরই মধ্যে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে জমা দিয়েছেন তিনি।
সামান্তার পদত্যাগ কিংবা তার বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে এনসিপির কোনো প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ বিবৃতিতে সামান্তা জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের সময়ই তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই এনসিপির মিত্র হওয়ার উপযুক্ত নয় বলে মনে করেন তিনি। তাই তিনি সতর্ক করেছিলেন, দলটির সঙ্গে জোট করলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।
সেই সতর্কবার্তার পরও এনসিপি জোটের পথে যাওয়ার পর সেই পথ থেকে ফেরাতে চেষ্টা চালিয়েছিলেন বলে জানান সামান্তা।
তিনি বলেন, ‘গত ১১ মাসে এনসিপির অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছি। পাশাপাশি আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে দলের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি। দল ভুল পথে গেলে তা থেকে ফিরিয়ে আনা নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব মনে করেই অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক সংগ্রাম চালিয়েছি।’
তাতে সফল না হওয়ায় সামান্তার মনে হচ্ছে, এনসিপিকে আর সে পথ থেকে ফেরানো সম্ভবপর নয়। এনসিপিও দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি আর আন্তরিক থাকতে পারবে না। তাই তিনি নিজেই সরে গেলেন।
তার ভাষ্য, ‘কোনো একটি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় পদত্যাগ করলে বিষয়টি সহজে ব্যাখ্যা করা যেত। কিন্তু দল ভবিষ্যতে জামায়াতের সঙ্গে জোট ত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত নিলে পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নিজস্ব পরিচয়, চিন্তা ও কর্মসূচি তৈরি করতে পারবে।’
জামায়াতকে সংস্কারের বন্ধু মনে করেন না সামান্তা
পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সামান্তা শারমিনের প্রথম অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের মাধ্যমে এনসিপি সংস্কারের রাজনীতি থেকে সরে গেছে। তার মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এসব সংস্কারকে নিজেদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র প্রকল্পের অংশ মনে করে না।
তিনি দাবি করেন, জামায়াত প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না। বরং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহারের প্রয়োজন থেকেই দলটি সংস্কারের কথা বলে। জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকাঠামো গণতান্ত্রিক নয়।
সামান্তার মতে, এনসিপি জামায়াতকে সংস্কারের সহযোগী মনে করায় উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ দলটির রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এতে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে এনসিপির নিজস্ব অবস্থানের পার্থক্য ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।
নিজস্ব রাজনীতি হারিয়েছে এনসিপি
নির্বাচন প্রসঙ্গে সামান্তা শারমিন বলেছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচন না হয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চরিত্র থেকে সরিয়ে ক্ষমতা বদলের নির্বাচনে পরিণত করেছে।
তার অভিযোগ, এনসিপির সামনে পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে মোকাবিলা করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু দলটি বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ১১-দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে অংশ না নিয়েও এনসিপি আরও বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারত। এ বিষয়ে পাঁচটি বিকল্প পদ্ধতির কথা দলের নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন সামান্তা।
নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ তুলে সামান্তা বলেন, শহীদ ওসমান হাদি ঢাকার একটি ঝুঁকিপূর্ণ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে এককভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। অথচ তার মৃত্যুর ঘটনাকে বড় দলের সঙ্গে জোট করার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
নারীর অধিকার ও নেতৃত্বের প্রশ্নেও অসন্তোষ
এনসিপির বিরুদ্ধে সামান্তা শারমিনের আরেকটি বড় অভিযোগ, দলটি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অবদান ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার যথাযথ স্বীকৃতি দিতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা, প্রতিরোধের অংশীদার ও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকর্তা ছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর পুরনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো নারীদের রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায্য হিস্যা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই প্রবণতার অনুসারী হয়েছে।’
তার মতে, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির সামনে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। শুধু নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দলটি সেই পথ অনুসরণ করেনি।
সামান্তা প্রশ্ন তোলেন, আন্দোলনের সময় নারীদের সাহস ও ত্যাগ গ্রহণ করা হলেও বিজয়ের পর তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ন্যায্য হিস্যা অস্বীকার করা হলে তাদের অংশগ্রহণের প্রকৃত স্বীকৃতি কোথায়?
কাউন্সিল না করে কমিটি পুনর্গঠনের সমালোচনা
এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সামান্তা শারমিন। তার অভিযোগ, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন না করে আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করার মধ্য দিয়ে দলটি পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর চর্চার পুনরাবৃত্তি করেছে।
তিনি বলেন, ‘দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্বের জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হলো নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন। কিন্তু কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠন করায় দলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে নেতৃত্ব নির্বাচন, নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।’
তার মতে, ‘যে দল নিজের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’
বিভাজনের বিপরীতে ঐক্যের আহ্বান
বিবৃতির শেষাংশে দেশের জন্য বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন সামান্তা শারমিন। তিনি বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যা ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকে একটি অভিন্ন জাতীয় আকাঙ্ক্ষার জায়গায় ঐক্যবদ্ধ করবে। তরুণদের নেতৃত্বে এনসিপিকে ঘিরে মানুষের সেই প্রত্যাশা থাকলেও সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসাব ও সিদ্ধান্তের কারণে সেই সম্ভাবনা হারিয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, নতুন রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি হতে হবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করতে হবে।
এ ছাড়া নারীর সমান অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করা, জাতীয় পুঁজির বিকাশ, দেশীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসের বিষয়েও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।



