খামেনির জানাজায় কূটনৈতিক বার্তা
- শত্রু, মিত্র আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভিন্ন আয়াতে সংকেত ইরানের

ছবি: রয়টার্স
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা শুধু ধর্মীয় কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখেনি দেশটি। তেহরান এ সময়টি কাজে লাগিয়েছে নিজেদের শক্তি প্রতিস্থাপনে। কূটনৈতিক বার্তা বিশ্বকে পৌঁছিয়ে দিতে। ৪ জুলাই দেশ-বিদেশের শক্তিধর নেতারা জড়ো হন তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায়। বাইরের দেশগুলোর প্রতিনিধিরা মোসাল্লায় খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় পেছনে চলে কোরআন তেলাওয়াত। দেশভেদে ইরান নির্ধারণ করে আলাদা সুরা এবং আয়াত। এটি শুধু ধর্মীয় রীতি নয়, বরং কঠোর কূটনৈতিক বার্তা সম্প্রচারে ব্যবহার করেছে দেশটি। মিত্র, শত্রু এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর জন্য ঠিক করা আয়াত অন্তত তাই প্রকাশ করে।
মিডেল ইস্ট আইয়ের একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের জন্য নির্বাচিত আয়াতে আছে কৌশলগত বার্তা। মঞ্চে প্রতিনিধিদের শ্রদ্ধা নিবেদনকালে ইরান নিজেদের অবস্থান এবং শক্তি তুলে ধরে বলেও উল্লেখ করা হয় এতে। আয়াতের মাধ্যমে দেশটি মিত্রদের আশ্বস্ত করে তেহরান নতি স্বীকার করেনি। প্রধান শক্তিগুলোকে বোঝায় দেশটিকে কাবু করা যায়নি। এ ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তারা সবকিছুর হিসাব রাখছে।
খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনে মোসাল্লায় কোরআন তেলাওয়াত করা হয় সৌদি আরব, রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের জন্য। তবে এসব দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সৌদি আরব। সৌদির জন্য নির্ধারিত আয়াতটি ছিল ‘আল-ইমরান ৩:১৩’। সুরার এ অংশে রয়েছে বদর যুদ্ধের বর্ণনা। সেই যুদ্ধে সংখ্যায় অনেক কম ও দুর্বলভাবে সজ্জিত মুসলিম বাহিনী ‘আল্লাহর ইচ্ছায়’ এক বিশাল শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করেছিল। সৌদির জন্য নির্ধারিত এ আয়াত দিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে নিজেদের জয় তুলে ধরেছে বলে প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনটিতে।
৬২৪ খ্রিস্টাব্দে সৌদি আরবে হয় বদর যুদ্ধ। এ আয়াত ইসলামের অন্যতম প্রথম বিজয়কে তুলে ধরে। তেহরান ও রিয়াদের মধ্যকার যৌথ সভ্যতার স্মৃতির প্রতি ইঙ্গিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে সৌদি কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বন্ধুত্বের সম্পর্ক ধরে রাখে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি গোপনে ইরানে হামলা চালায় বলেও অনেক রিপোর্টে উঠে এসেছে। নিজ দেশে হামলা চলাকালে ইরান মিত্র মুসলিম দেশ লেবাননের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বিচ্ছিন্ন অবস্থানে এ আয়াত দিয়ে ইরান সৌদির প্রশংসা করল না বিদ্রূপ, নাকি দুটোই করল— সে প্রশ্ন থেকে যায়।
প্রতিরোধের ঘাঁটি: খামেনির শোকানুষ্ঠানে হামাস, হিজবুল্লাহ, হুথি, তালেবানের জন্য নির্ধারিত আয়াতে ছিল শাহাদাতবরণ, ঈশ্বরের প্রতি অটল অঙ্গীকার এবং বিজয়ের ইঙ্গিত। হামাসকে স্বাগত জানানো হয় একটি আয়াত দিয়ে। যেখানে তাদের ব্যাখ্যা করা হয় ‘অঙ্গীকারে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আনেনি’ এমন এক জাতি হিসেবে। আয়াতটিতে আরও আছে— ‘যারা আল্লাহর কাছে করা প্রতিজ্ঞার প্রতি সত্যনিষ্ঠ প্রমাণিত হয়েছে’, তাদের প্রতিজ্ঞা পূরণ করেছে এবং ‘তাদের পালা আসার অপেক্ষায় আছে’।
হিজবুল্লাহর আয়াতে ‘সত্যিকারের বিশ্বাসীদের’ ‘অগ্রাধিকার’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সামরিক পরাজয়কে এক ঐশ্বরিক চক্রের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এ চক্রে আল্লাহ ‘শহীদদের বেছে নেন’ এবং কোন ব্যক্তি বিশ্বস্ত থাকে তা প্রকাশ করেন। ইয়েমেনের হুথিদের জন্য নির্বাচিত আয়াতটি ছিল সুরা আল-ফাতহ-এর ২৯ নম্বর আয়াত। এটিতে শৃঙ্খলা এবং চাপের মুখে বিকাশের একটি অংশ তেলাওয়াত করা হয়।
মিত্র দেশ: ইরানের মিত্র দেশ রাশিয়া, চীন, ভারত, মিসর। তাদের জন্য বরাদ্দ আয়াতে ছিল স্থির মনোভাব। ছিল সংগ্রামের পরিবর্তে ন্যায়পরায়ণতা, আশ্বস্ততা ও প্রতিদানের ইঙ্গিত।
রাশিয়ার জন্য আয়াতে ‘পরকালের চিরস্থায়ী আবাস’-এর কথা বলা হয়েছে। এটি ‘তাদের জন্য সংরক্ষিত যারা পৃথিবীতে অত্যাচার বা দুর্নীতির অন্বেষণ করে না’— এই বলে উপসংহার টানা হয়েছে যে, ‘চূড়ান্ত পরিণতি সৎকর্মশীলদেরই প্রাপ্য’। চীনের জন্য আয়াতটিতে ছিল আরও শান্ত— ‘আল্লাহ এটা কেবল তোমাদের জন্য সুসংবাদ এবং তোমাদের হৃদয়ের জন্য আশ্বাস হিসেবেই নির্ধারণ করেছেন। আর বিজয় কেবল আল্লাহর কাছ থেকেই আসে।’ হিজবুল্লাহর জন্য ব্যবহৃত একই ‘বিচলিত হয়ো না বা দুঃখ করো না’ আয়াতটি নির্ধারণ করা হয়েছিল ভারতের জন্য। কিন্তু একই অনুচ্ছেদের একটি নরমতর অংশ।
মিসরকে দেওয়া হয়েছে ‘যারা বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম করে’, তারা ‘সকল সত্তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ’। তাদের জন্য এমন জান্নাত নির্ধারিত যেখানে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট।




