৬ লাখ তালবীজ বপন করেছেন চিত্তরঞ্জন

তালবীজ বপনের জন্য রাস্তার ধারে জায়গা প্রস্তুত করছেন চিত্তরঞ্জন দাস। ছবি: আগামীর সময়
গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ হোক কিংবা বর্ষার অঝোর ধারা— সাইকেলের হ্যান্ডেলে বাঁধা বস্তায় তালের বীজ, সঙ্গে একটি কোদাল, দা আর পানির বোতল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এক বৃদ্ধ। আপন মনে রাস্তার পাশে, পুকুরপাড়ে কিংবা রেললাইনের ধারে বুনে চলেন তালের বীজ। কারণ, তার একটাই লক্ষ্য— বজ্রাঘাত থেকে মানুষকে বাঁচানো।
যশোরের অভয়নগর উপজেলার ধোপাদী গ্রামের এই বৃদ্ধের নাম চিত্তরঞ্জন দাস (৭০)। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘চিত্ত দা’ বা ‘বৃক্ষপ্রেমী চিত্তরঞ্জন’ নামেই বেশি পরিচিত। গত ১৮ বছরে তিনি নিজ উদ্যোগে বপন করেছেন প্রায় ছয় লাখ তালবীজ এবং ২৫ হাজার খেজুরের বীজ।
পেশায় ক্ষুদ্র কাঠব্যবসায়ী চিত্তরঞ্জনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ২০০৮ সালের একটি ঘটনা। একদিন চায়ের দোকানে বসে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছিলেন। পাশেই পত্রিকা পড়ছিলেন এক ব্যক্তি। পত্রিকায় তালগাছের ছবি দেখে চিত্তরঞ্জন কৌতূহলী হন। তখন ওই ব্যক্তি তাকে পড়ে শোনান, আমেরিকার এক বিজ্ঞানী গবেষণায় পেয়েছেন— তালগাছ প্রচুর অক্সিজেন দেয় এবং উঁচু এই গাছটি বজ্রাঘাতকে দুর্বল করে দিয়ে মানুষের প্রাণ বাঁচায়।
কথাটি চিত্তরঞ্জনের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে। তা ছাড়া মৃত্যুর আগে তার বাবাও তাকে বজ্রনিরোধক তালগাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। চিত্তরঞ্জন সিদ্ধান্ত নেন, তিনি মানুষকে বাঁচাতে তালগাছ লাগাবেন। সেই থেকে শুরু, যা আজও চলমান।
কাঠ বিক্রি করে যে আয় হয়, তার একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেন গাছের পেছনে। এক হাজার তালবীজ কেনা থেকে বপন পর্যন্ত তার প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়। গত ১৮ বছরে এই বৃক্ষরোপণের পেছনে তিনি ব্যয় করেছেন ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকা।
ভবদহ অঞ্চলের প্রায় ৫০টি গ্রাম ঘুরে, মানুষের বাড়ি থেকে, এমনকি আবর্জনার স্তূপ থেকেও তিনি তালবীজ সংগ্রহ করেন। তার এই যাত্রায় পাঁচ বছর ধরে সঙ্গী হয়েছে তার নাতি অর্পণ দাস। ধোপাদী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী স্কুল শেষে দাদাকে তালগাছ লাগাতে সাহায্য করে।
স্থানীয় বাসিন্দা জাফর আলম বললেন, ‘প্রথমদিকে তাকে সবাই পাগল বললেও আজ তাকে সবাই সম্মানের চোখে দেখেন। তিনি পরিবেশের জন্য যা করেছেন, তা এক বিশাল অবদান।’
২০০৮ সালে চিত্তরঞ্জনের বোনা প্রথম দিকের বীজগুলো থেকে আজ বিশাল বিশাল গাছ হয়েছে। অভয়নগর, মনিরামপুর ও নওয়াপাড়ার ১২৮টি সড়কের দুই ধার এখন তালগাছে ছাওয়া। সেই গাছগুলোয় তাল ধরছে, তীব্র গরমে পথচারীরা ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন, আর মাঠে কাজ করা কৃষকরা বজ্রপাতের সময় নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছেন। গাছে গাছে দুলছে বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে চিত্তরঞ্জনের এই উদ্যোগের কথা ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা এবং পিরোজপুরের কাউখালীতে তিনি ১০ হাজার তালবীজ বপন করে এসেছেন। তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পুরস্কৃত করেছে অভয়নগর উপজেলা প্রশাসন। অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ সালাউদ্দিন দিপু বললেন, চিত্তরঞ্জন দাস নিজ উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় সড়কের দুপাশে অসংখ্য তালবীজ বপন করেছেন, যা এখন দৃশ্যমান। ভবিষ্যতে এ তালগাছগুলো দেশের সম্পদ হয়ে থাকবে।




