ভাগাড়ে নয়, শিশুর আশ্রয় হোক সন্তানহীন মায়ের বুকে

শাহানা হুদা রঞ্জনা
জন্মের পর যে নিষ্পাপ শিশুটির থাকার কথা ছিল মায়ের ওমে, বাবার নিরাপদ আশ্রয়ে, সেই কি না নিক্ষিপ্ত হলো হাসপাতালের এক কোণে জমে থাকা ময়লার স্তূপের মধ্যে! গভীর রাতে যখন চারপাশ নিঝুম, তখন হাসপাতালের কর্মীরা কান্নার শব্দ শুনে খুঁজে পান তাকে। কী এক ভয়াবহ, বুক কাঁপানো হৃদয়বিদারক দৃশ্য! চিকিৎসকরা জানালেন, উদ্ধারের ঠিক কিছুক্ষণ আগেই হয়তো পৃথিবীর আলো দেখেছে মেয়েটি। নরম মাথায় তখনো টাটকা আঘাতের ক্ষত। নাম রাখা যাক ‘পরী’। পরীর মতোই ফুটফুটে এই শিশুটি কি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে? কোনো মমতাময়ী মায়ের কোল কি জুড়াবে ও? জানি না। শুধু ভাবছি এই অসহায় শিশুটির কথা, মায়ের অন্ধকার গর্ভ থেকে যে সরাসরি ছিটকে পড়ল পৃথিবীর এক ভাগাড়ে! যেখানে ক্ষণিকের অসতর্কতায় ওকে খুবলে খেতে পারত কুকুর, শিয়াল কিংবা বিষাক্ত পোকামাকড়।
পরীর ভাগ্য ভালো যে ও বেঁচে গেছে। কিন্তু ওর মতো কতশত নবজাতককে প্রতি বছর এমন নির্মমতার শিকার হতে হয়। ময়লার ভাগাড়, নালা-নর্দমা, ব্যাগে বন্দি হয়ে রাস্তার ধার, অন্ধকার ঝোপঝাড়, চলন্ত যানবাহন কিংবা গণশৌচাগারে ফেলে যাওয়া হচ্ছে জীবনের প্রথম স্পন্দনকে। অথচ ওদের একমাত্র অপরাধ— ওরা জন্মেছিল। সংবাদমাধ্যম ও শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, শুধু ২০২৪ সালেই সারা দেশে ৯৪ জন পরিত্যক্ত নবজাতক উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ৬৪ জনই ছিল নিথর, মৃত। মাত্র ৩০ জন বেঁচে ছিল আলোর মুখ দেখার জন্য। ২০২৫-২৬ সালেও এই নির্মমতার ধারা থামেনি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায়ই ডাস্টবিন কেঁপে উঠছে নবজাতকের কান্নায়।
অনাথ শিশুদের দত্তক বা আইনগত অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করার আইনি প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গতিশীল করা হোক
ভাগ্য যাদের সুপ্রসন্ন, তারা হয়তো কোনো নিঃসন্তান দম্পতির পরিবার পায়, নয়তো জায়গা হয় সরকারি শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে। ঠিক যেমনটি পেয়েছিল ‘ফুল’ (ছদ্মনাম)। জন্মের পরপরই তাকে পলিথিনে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, তার আগে মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে। কিন্তু অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া ফুল যখন হাসপাতালে সবার ভালোবাসায় চোখ মেলে হাসত, তখন চারপাশটা স্বর্গীয় মনে হতো। ফুল আজ একটি মায়ায় ঘেরা পরিবার পেয়েছে। কিন্তু সব শিশু কি ফুলের মতো ভাগ্য নিয়ে আসে? নাকি অনেকের জীবন কেটে যাবে সরকারি এতিমখানার চার দেয়ালে? অথচ প্রতিটি শিশুরই তো অধিকার আছে মা-বাবার নিঃশর্ত স্নেহ পাওয়ার।
১৩০০ শতাব্দীর ফার্সি কবি সুফি মওলানা জালালউদ্দীন রুমি বলেছিলেন, ‘যখন তুমি প্রাণ থেকে, আত্মা থেকে কোনো কাজ করো, তখন তুমি অনুভব করবে একটি নদী তোমার ভেতরে তিরতির করে বইতে শুরু করেছে। সেই নদীর নাম আনন্দ।’ রুমির সেই আনন্দের নদীটিই হচ্ছে কুড়িয়ে পাওয়া একটি শিশুর জন্য পরিবার খুঁজে পাওয়া, আর সন্তানহীন মা-বাবার কাছে একটি শিশুর নরম হাতের স্পর্শ পাওয়া।
অপরাধবিজ্ঞানীরা বলেছেন, সমাজে সাধারণত বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক, স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়া, কিংবা ধর্ষণের শিকার নারীর গর্ভে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত শিশুগুলোর ক্ষেত্রেই এমন নির্মম পরিণতি বেশি ঘটে। এর বাইরে অন্ধ সামাজিক কুসংস্কারের কারণে কন্যাশিশু জন্ম নিলেও অনেক পরিবার তাদের রাস্তায় ফেলে দেয়। কিন্তু যারা তাদের গর্ভজাত সন্তানকে রাখতে চান না, তাদের প্রতি আকুল আবেদন— আপনারা তো সুস্থ অবস্থায় বাচ্চাটাকে কোনো হাসপাতাল, মসজিদ কিংবা কোনো বাড়ির দরজায় রেখে আসতে পারেন। অন্তত একটি জীবন তো বাঁচবে! রাষ্ট্র ও সমাজের কাছেও আমার চাওয়া, ভবিষ্যতে এমন একটি নিরাপদ আইনি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হোক, যেখানে পরিচয় গোপন রেখে সন্তানহীন পরিবারের কাছে শিশু হস্তান্তর করা যাবে।
একদিকে এক টুকরো সন্তানের জন্য কত শত দম্পতি বছরের পর বছর চোখের জল ফেলছেন, চিকিৎসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন; অন্যদিকে নির্মমভাবে এক সদ্যোজাতকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে ডাস্টবিনে। এমন বৈপরীত্য মেনে নেওয়া কঠিন। পরীর যেমন দরকার একজোড়া মমতাময়ী হাত, তেমনি বহু দম্পতিরও প্রয়োজন এক টুকরো চাঁদের আলো। একটি শিশু যেমন শূন্য এক দম্পতির একাকিত্ব মুছিয়ে দিতে পারে, তেমনি সেই পরিবারটি শিশুটিকে দিতে পারে একটি সুস্থ সামাজিক পরিচয় ও সুন্দর ভবিষ্যৎ।
সরকারি ‘ছোটমণি নিবাস’গুলোর দিকে তাকালে বুকটা হুহু করে ওঠে। নবজাতক থেকে শুরু করে সাত-আট বছরের ২৫-৩০ মা-বাবাহীন শিশু যেখানে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে একটু ভালোবাসার জন্য। কেউ সামান্য চকলেট, মিষ্টি বা রঙপেনসিল নিয়ে গেলে ওদের আনন্দের সীমা থাকে না। ওদের নিজেদের বলতে কেউ নেই, শুধু পরার্থপর মানুষের ভালোবাসার ওপর ভর করে ওরা বেঁচে থাকে।
তাই আমাদের জোরালো প্রত্যাশা, এই অনাথ শিশুদের দত্তক বা আইনগত অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করার আইনি প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গতিশীল করা হোক। প্রতিটি সন্তানহীন মায়ের শূন্য বুক যেন ভরে ওঠে কোনো এক পরিত্যক্ত শিশুর আশ্রয়ে। শিশুর জন্ম যেখানেই হোক না কেন, তার বেড়ে ওঠার পৃথিবীটা যেন হয় আনন্দময় ও নিরাপদ।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং কলাম লেখক




