বৃষ্টি নেই পানি নেই, দুশ্চিন্তা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৈশ্বিক জলবায়ু উষ্ণায়নে উন্নত বিশ্বের কিছু অপরিণামদর্শী দেশের ভূমিকা বেশি হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে, যদিও বাংলাদেশের দায় অতি নগণ্য। তবু সইতে হচ্ছে ভোগান্তি। এরই মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চল প্রায় মরূকরণের পথে। বৃষ্টিপাতও কমছে আশঙ্কাজনকভাবে। গতকাল রবিবারের আগামীর সময় জানাচ্ছে, ‘আষাঢ়েও নেই বাদল, ৩০% বৃষ্টি কম জুনে, পাঁচ দশকে রাজশাহীতে বৃষ্টি কমেছে ৩৪% ও লাউয়াছড়ায় পানির সংকট বিপাকে বন্যপ্রাণী।’ খবরগুলো প্রাণ-প্রকৃতির জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। ঋতুবৈচিত্র্য যে আর আগের মতো চিরাচরিত রূপে নেই, তা দৃশ্যমান। ঋতুর নিয়মে এখন চলছে বর্ষাকাল। রূপময় বর্ষার দেশ বাংলাদেশে এখন আষাঢ় মাসেও দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বাদলধারা। পাশাপাশি অন্য মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টির ফলে ভোগান্তিও জনজীবনে দৃশ্যমান।
জলবায়ু পরিবর্তনের এক চরম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার রাজশাহী। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত পাঁচ দশকে রাজশাহীতে সামগ্রিক বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ, আর ভরা বর্ষার মাস জুনে (আষাঢ়ের শুরু) বৃষ্টিপাত হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান শুধু একটি অঞ্চলের আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়; বরং গোটা বাংলাদেশের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক সতর্কবার্তা।
রাজশাহীর এই জলবায়ুগত রূপান্তর কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, কয়েক দশক ধরে চলা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং স্থানীয় পরিবেশগত অবক্ষয়ের সম্মিলিত ফল। রাজশাহী ও এর আশপাশের বরেন্দ্র অঞ্চলে এমনিতেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। তার ওপর বৃষ্টিপাত এক-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়া মানে এই অঞ্চলটি দ্রুত মরূকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ফারাক্কার বাস্তবতা।
রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলকে বলা হয় দেশের অন্যতম শস্যভাণ্ডার। আম, ধান ও সবজি উৎপাদনে এই অঞ্চলের ভূমিকা অপরিসীম। আষাঢ়ে বৃষ্টি না হওয়ায় আমন চাষও ব্যাহত হচ্ছে। এ ধারা চলতে থাকলে সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়তে হবে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে স্থানীয় নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং জলজউদ্ভিদ বিলুপ্তির পথে, যা সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
এই ভয়াবহ জলবায়ু সংকট থেকে বাঁচতে হলে এখনই সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হারিয়ে যাওয়া পুকুর ও খালগুলো খনন করে আবার জীবিত করতে হবে। বর্ষার অবশিষ্ট পানি ধরে রাখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ব্যাপক হারে স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে। বনায়নের এ উদ্যোগ শুধু আঞ্চলিক ভিত্তিতে নয়, পুরো দেশকে এর আওতায় আনতে হবে। প্রাণ-প্রকৃতির ঘোর শত্রু শিল্প-কলকারখানার বর্জ্য শোধন করা ও কার্বন নিঃসরণ একেবারে নির্মূল না করলে পরিবেশ দূষণের হাত থেকে বাঁচা যাবে না। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা রক্ষা এবং স্থানীয় তাপমাত্রা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। যেকোনো মূল্যে প্রাকৃতিক জলাভূমি ও নদী দখল বন্ধ করতে হবে। নগরায়ণের নামে নদী, খাল, পুকুর ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাজশাহীতে পাঁচ দশকে ৩৪ শতাংশ বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। সরকার, পরিবেশবিদ এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত চেষ্টাই পারে পরিবেশের এ মন্দদশা থেকে উত্তরণ ঘটাতে। এ বিষয়ে অার অবহেলা নয়। নিজেরা যদি সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্মকে খরা ও বৃষ্টিহীনতার চড়া মূল্য দিতে হবে।




