আসকের প্রতিবেদন
ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৬৬, আহত ২৮৫৩
- পিটুনিতে ১১৩ জনের মৃত্যু, সর্বোচ্চ ঢাকা বিভাগে
- সীমান্তে বিএসএফের সহিংসতায় নিহত ১০
- কারা হেফাজতে ৬১ জনের মৃত্যু

৬ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ৩৭৪টি, আসকের প্রতিবেদন। ছবি: সংগৃহীত
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্তত ৩৭৪টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৬৬ জন নিহত এবং ২ হাজার ৮৫৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
সংস্থাটি বলছে, সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে। পাশাপাশি দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক সংঘর্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত এবং দুর্বৃত্তদের হামলাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ঘটেছে।
সোমবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ডকুমেন্টেশন ইউনিটের প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। এছাড়া গত ছয় মাসে দেশে পিটুনিতে ১১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সীমান্তে বিএসএফের সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১০ জন ও আহত হয়েছেন ১০ জন। অপরদিকে গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কারা হেফাজতে অন্তত ৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা
আসকের প্রতিবেদন বলছে, ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি ১৩০টি সংঘর্ষ হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। এসব ঘটনায় ১ হাজার ১ জন আহত এবং ৯ জন নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সংঘর্ষে এটিই সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলকেও সহিংসতার অন্যতম উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ৮৩টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৭৮৬ জন আহত এবং ১৪ জন নিহত হয়েছেন, যা অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অভ্যন্তরীণ ৩টি ঘটনায় ২২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও যুবদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধে ৪টি ঘটনায় ৬১ জন আহত এবং ১ জন নিহত হন। ছাত্রদল, শ্রমিক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যেও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-এর মধ্যে ১৬টি সংঘর্ষে ২২৫ জন আহত এবং ৪ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে ১৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১১২ জন। এছাড়া বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৩৭টি সংঘর্ষে ২৭০ জন আহত এবং ১ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মীদের সংঘর্ষেরও একটি ঘটনা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চ ও পুলিশের মধ্যে একটি সংঘর্ষে ৬৫ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে রাজনৈতিক সহিংসতার বাইরে দুর্বৃত্তদের হামলাও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলির ৩৩টি ঘটনায় ৩২ জন নিহত এবং ১৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া দুর্বৃত্তদের হামলায় বিএনপির ৯টি ঘটনায় ২৬ জন এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিদের ওপর ৩টি ঘটনায় ৭ জন আহত হয়েছেন।
পিটুনিতে ১১৩ জনের মৃত্যু
গত ছয় মাসে মব সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছেন ১১৩ জন। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে নিহত হয়েছেন ৩৮ জন। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে পিটুনিতে নিহত হয়েছেন ২৭ জন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ৩৮ জন, চট্টগ্রামে ২৭ জন, খুলনায় ১৫ জন, রাজশাহীতে ১২ জন, বরিশালে ১০ জন, ময়মনসিংহে ৭ জন এবং রংপুর বিভাগে ৪ জন পিটুনিতে নিহত হয়েছেন।
বিএসএফের সহিংসতায় নিহত ১০
গত ছয় মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) সহিংসতায় অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গুলিতে ৭ জন এবং শারীরিক নির্যাতনে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ১০ জন আহত এবং ১ জনকে আটক বা অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএসএফের গুলিতে নিহত ৭ জনের মধ্যে সিলেট সীমান্তে ৩ জন, রংপুরে ২ জন এবং চট্টগ্রাম সীমান্তে ২ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, শারীরিক নির্যাতনে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী সীমান্তে ২ জন এবং রংপুর সীমান্তে ১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
কারা হেফাজতে ৬১ জনের মৃত্যু
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কারা হেফাজতে অন্তত ৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ৩৭ জন ছিলেন বিচারাধীন (আন্ডার-ট্রায়াল) বন্দি এবং ২৪ জন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে মোট ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭ জন ছিলেন বিচারাধীন এবং ১৯ জন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সেখানে মোট আটজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে সাতজন বিচারাধীন এবং একজন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে পাঁচজন করে বন্দির মৃত্যু হয়েছে। উভয় বিভাগেই মৃতদের মধ্যে চারজন ছিলেন বিচারাধীন এবং একজন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি।
এছাড়া বরিশাল বিভাগে দুইজন এবং রংপুর বিভাগে দুইজন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। রংপুরে মারা যাওয়া দুজনই ছিলেন বিচারাধীন বন্দি। সিলেট বিভাগে একজন বিচারাধীন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। আর ময়মনসিংহ বিভাগে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একজন বিচারাধীন এবং একজন দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি ছিলেন।




