হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার পেছনে এমবাপ্পে-কেইন

কিলিয়ান এমবাপ্পে ও হ্যারি কেইনের
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা যখন বাঁশিতে সুর তুলছিলেন, শহরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সবাই তার পেছনে ছুটতে শুরু করেছিল। এই বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির পায়েও আছে তেমন এক অদৃশ্য বাঁশি। তার সুর মানুষকে নয়, জাগিয়ে তুলেছে ফুটবলের গোলকে।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে মেসি আলোড়ন তুলেছিলেন গোলের। সেই যে জাদুকর বিশ্বকাপের আকাশে গোলের সুর ভাসিয়ে দিলেন, এরপরই তার প্রতিধ্বনি শোনা গেল সব তারকার পায়ে। এমবাপ্পেও ছুটলেন তার পিছু, যোগ দিলেন আর্লিং হলান্ডও। হ্যারি কেইনও বসে থাকার পাত্র নন। এ যেন এক অদ্ভুত সিম্ফনি। একজন সুর তুলেছেন, বাকিরাও সেই সুরে নিজেদের বাদ্যযন্ত্র মেলাচ্ছেন। কেউ কারও অনুসারী নন, কিন্তু সবাই যেন একই অর্কেস্ট্রার শিল্পী। তারা আসলে গোলের শিল্পী।
বিশ্বকাপে গোল বা গোল্ডেন বুটের এ লড়াই সাধারণত এত জমে না। কোনো একজন একটু একটু করে ছাড়িয়ে যান বাকিদের। কিন্তু এবার দৃশ্যপট ভিন্ন, বিশ্বকাপের শতবর্ষের ইতিহাসে এমন খুব কমই দেখা গেছে। আগে যেখানে ছয়-সাত গোলে সেরা গোলদাতা নিশ্চিত হয়ে যেত, এবার আট গোলেও নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না কেউ। সর্বোচ্চ ৮ গোল করে আছে মেসি-এমবাপ্পের।
মেসি এগিয়ে থাকতে পারতেন এককভাবেই। দুটি পেনাল্টি মিস না করলে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের গোল সংখ্যা হতো ১০। সামনে তার আরও ম্যাচ আছে। তাহলে ফরাসি কিংবদন্তি জুস্ত ফতেঁর সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে যেতে পারত অনায়াসে। তবে এখনো যে ওই রেকর্ড নিরাপদ তা বলা যাবে না। কোনো ম্যাচে জাদুকরের পায়ে গোলের মহাসমারোহ ঘটলে বিশ্বকাপের মহাবিস্ময় হতে কতক্ষণ। এ পর্যন্ত ২৯টি শট নিয়ে ১৭টি রেখেছেন লক্ষ্যে, গোলে রূপান্তরের হার ২৭.৬ শতাংশ। পেনাল্টি ছাড়া ওপেন প্লেতেই বাড়ে তার গোল। এখনো পর্যন্ত তার অ্যাসিস্ট একটি।
মেসি খেলেছেন ৪১০ মিনিট, যা তার চার প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। গোল ও অ্যাসিস্ট সমান হয়ে গেলে কতক্ষণ খেলেছেন সেই হিসাবটা চলে আসবে সামনে। এখন পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপ্পে ৮ গোল করলেও ৩ অ্যাসিস্টের সুবাদে এগিয়ে আছেন। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটজয়ী এ ফরাসি স্ট্রাইকার টানা দুই আসরে ৮ গোলের রেকর্ড গড়েছেন।
হলান্ডের পরিসংখ্যানও বলছে এক নিখুঁত স্ট্রাইকারের গল্প। ব্রাজিলের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় জোড়া গোল করে তিনি পাস করেছেন লেটার মার্ক নিয়ে। ১৮ শটের মধ্যে ১২টিই লক্ষ্যে, তার মধ্যে গোল ৭টি। তার বড় সুযোগ কাজে লাগানোর হার ৫৪.৫ শতাংশ। তার বড় পরীক্ষা হবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল।
প্রতিপক্ষে আছে হ্যারি কেইন, যিনি ৬ গোল, একটি অ্যাসিস্ট নিয়ে আপাতত চতুর্থ স্থানে আছেন। তিনি খেলেছেন ৪৪৩ মিনিট। ১৯টি শটের ১০টিই রেখেছেন লক্ষ্যে। বড় সুযোগ কাজে লাগানোর হার ৫৭.১ শতাংশ, যা প্রতিদ্বন্দ্বী তিনজনের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইংল্যান্ড ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে গেলে তিনিই ছাড়িয়ে যেতে পারেন সবাইকে। কারণ কেইন হলো নদীর স্রোত— কোলাহল নেই কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে জানেন।
চারজনেরই চাররকম সৌন্দর্য। তাদের মিল এক জায়গায়— ছুটছেন গোলের পেছনে। তাই বিশ্বকাপ শুধু ট্রফি নয়, গোলের উৎসবও বটে। এ কারণেই বিশ্বকাপ এত রঙিন। আর এ গোলের গল্পের শুরুতে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ, লিওনেল মেসি। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো নয়, বরং এমন এক শিল্পী যিনি গোলের আলোড়ন তুলে বিশ্বকাপে গোলের সুর তুলেছেন। সেই সুরে নাচছে এমবাপ্পে, হলান্ড, কেইন আর মুগ্ধ হয়ে দেখছে ফুটবলবিশ্ব।




